‘রিলিফই পাইনা, ঘর দিবে হামাক?’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ২২ এপ্রিল ২০২০

স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এক বৃদ্ধা মা। ভিক্ষা আর অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চললেও করোনার প্রভাবে এখন খেয়ে না খেয়ে ঝুপড়ি ঘরেই দিনা যাপন করছেন অসহায় মা-মেয়ে। নিঃস্ব এই পরিবারের ভাগ্যে জোটেনি কোনো ধরনের ভাতা কিংবা জনপ্রতিনিধির সাহায্য-সহযোগিতা।

ভিক্ষাবৃত্তি আর অন্যের বাড়িতে কাজ করেই চলে মা-মেয়ের সংসার। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস ঝড়ে বছর তিনেক আগে একমাত্র টিনশেড ঘরটি ভেঙে যায়। ভিক্ষা করে যা আয় হয় তা দিয়েই দিন চলে। ঘর ঠিক করা স্বপ্ন ছাড়া কিছুই না। তাই দীর্ঘদিন ধরে ভেঙে পড়া ঘরের দরজা-জানালা না থাকায় টিন ফাঁকা করে হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকেন এবং বের হন বৃদ্ধা ছালেহা বেওয়া। হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করে মাটিতেই ছেড়া কাপড় আর কাঁথা বিছিয়ে ঘুমাতে হয় তাকে। পাশে একটা ঝুপড়ি ঘরের ব্যবস্থা করে মেয়ে শাহিদা থাকেন। বর্তমানে করোনা সংক্রমণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে এই পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার।

এমনই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার নাজিম খাঁ ইউনিয়নের ঝাড়িঝাড় গ্রামের বাসিন্দা ছালেহা বেগম (৭০) এবং তার মেয়ে শাহিদা বেগম (৪০)।

Sleha-(3).jpg

বৃদ্ধা ছালেহা বেওয়া জানান, স্বামী বদিয়ত উল্লাহ মারা গেছেন প্রায় ৩০-৩৫ বছর হবে। একমাত্র মেয়ে শাহিদা বেগমকে নিয়েই তার সংসার। জন্মের পরে বাবাকে দেখেনি শাহিদা বেগম। প্রায় ২০ বছর আগে অনেক স্বপ্ন দেখে মেয়েকে বিয়ে দেন পার্শ্ববর্তী উলিপুর উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা শমেস কাজির সঙ্গে। বিয়ে হলেও স্বামীর বাড়ি যাওয়া হয়নি শাহিদার। মেয়ের জ্ঞান-বুদ্ধি কম থাকায় তাকে স্বামী ছেড়ে গেছে প্রায় ১৭ বছর আগে। ভিটে-মাটি বলতে পৈতৃকভাবে পাওয়া ১০ শতক জমি রয়েছে বৃদ্ধা ছালেহা বেওয়ার। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীত-গ্রীষ্মে তাতে দিন কেটে গেলেও কেউ খোঁজ রাখেনি।

তিনি আরো বলেন, ‘মেম্বার-চেয়ারম্যানের পাও ধরছং তাও মোক কোনো ভাতা আর ইলিফের চাল দেয় নাই। এলা কি ভাইরাস বের হইছে ঘর থাকি বেরা যায় না। ভিক্ষা করবার পাং না। চেয়ারম্যানের কাছত গেছং চেয়ারম্যান কই তুই ভিক্ষা করি খাস তোর কি সাহায্য নাগে।’

শাহিদা বেগম বলেন, ‘মুই মানসের বাড়ি বাড়ি কাজ করি। করোনার কারণে সেই কাজও প্রায় বন্ধ। কোনোদিন কাজ জুটলে মা-মেয়ে দু’জনের খাবার জোটে না হলে উপোস থাকা নাগে। শুনছি সরকারি ঘর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। হামরা রিলিফই পাইনা, আরো ঘর দিবে হামাক?’

Sleha-(3).jpg

প্রতিবেশী মজিবর রহমান ও তাহেরা বেগম বলেন, মা-মেয়ের দুর্দশার কথা প্রতিবেশীরা সবাই জানে। স্থানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যান কোনো কিছুই দেয় না। শোনা যায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থাকলেও জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি আর দুর্নীতির কারণে বঞ্চিত হয়ে আসছে এই পরিবারটি।

প্রাকৃতিক কাজ সারতে গেলেও জঙ্গলে যেতে হয় তাদের। এমন দুরবস্থা দেখে স্থানীয় কিছু যুবক মিলে একটি টিউবওয়েল স্থাপন করে দিয়েছে।

নাজিম খাঁ ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক পাটেয়ারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখন করোনার জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছি। যেকোনো বিষয় পরে কথা হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যোবায়ের হোসেন বলেন, চাহিদা মোতাবেক ত্রাণের পরিমাণ অপ্রতুল। তবে তিনি এমন অসহায় পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

নাজমুল হোসেন/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।