ভাগ না দেয়ায় গরিবের আড়াই কোটি টাকা দেননি প্রকল্প কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:১৪ পিএম, ২২ মে ২০২০

করোনাভাইরাসের দুর্যোগে অসহায় ও দরিদ্রদের সহায়তা দিচ্ছে সরকার। কিন্তু করোনা মহামারির ভেতরে হতদরিদ্রদের দুই কোটি ৬৩ লাখ ছয় হাজার টাকা চার মাস ধরে আটকে রেখেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। এ অবস্থায় একবেলা খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে রয়েছেন এসব খেটেখাওয়া মানুষ।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪০ দিন; দৈনিক ২০০ টাকা মজুরিতে ‘অতি হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’ নামের একটি সরকারি প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ করেছিলেন এসব দরিদ্র মানুষ।

৪০ দিনের মজুরি হিসাবে প্রত্যেকের ৮ হাজার টাকা করে পাওয়ার কথা। কিন্তু করোনা মহামারির এই কঠিন সময়ে কোনো কারণ ছাড়াই টাকা আটকে রাখায় দরিদ্র মানুষগুলো চরম সংকটের মধ্যে আছেন। টাকার জন্য ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত তারা। পাওনা থেকে অর্ধেক টাকা কেটে রাখার প্রস্তাবে দিনমজুররা রাজি না হওয়ায় টাকা আটকে রেখেছেন শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার দরিদ্র মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের জন্য ২০১৭ সাল থেকে ১৫টি ইউনিয়নে সরকারি এ প্রকল্পটি চালু রয়েছে। বছরে দুইবার ৪০ দিন করে মোট ৮০ দিন দরিদ্ররা গ্রামীণ সড়কসহ সরকারের বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে শ্রমিকের কাজ করার সুযোগ পান।

বছরের মার্চ থেকে মে প্রথম পর্যায়ে ও নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ করেন তারা। শিবগঞ্জের ১৫ ইউনিয়নে মোট ৩ হাজার ২৮৭ জন অতিদরিদ্র কর্মহীন দিনমজুর এ কাজের জন্য তালিকাভুক্ত। কাজ শেষের দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের মজুরি ব্যাংকের হিসাবে পাঠিয়ে দেয়ার কথা। সেই হিসাবে গত ফেব্রুয়ারির মধ্যেই প্রত্যেকের ব্যাংক হিসাবে টাকা পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জানুয়ারি মাসে কাজ শেষ করলেও বুধবার (২০ মে) ঈদের আগের শেষ কর্মদিবসেও তাদের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হয়নি।

উপজেলার একাধিক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, মজুরির অর্ধেক টাকা কেটে রাখার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তিন মাস ধরে শ্রমিকদের মজুরি আটকে রাখা হয়েছে। কারোনাকালেও এ টাকা ছাড়েনি উপজেলা প্রশাসন।

শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রাজিব রাজু বলেন, কাজ শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমরা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দফতরে শ্রমিকদের নামের তালিকা, ব্যাংক হিসাব নম্বর ও সিরিয়াল আইডি জমা করেছি। উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন সভাতেও আমরা চেয়ারম্যানরা এ টাকা ছাড় দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) টাকা ছাড়েননি। এখানে বড় গণ্ডগোল আছে। সবকিছু ফোনে খুলে বলা যাবে না। বলতে পারেন অজ্ঞাত কারণে দিনমজুরদের টাকা আটকে রেখেছে উপজেলা প্রশাসন।

শিবগঞ্জের একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হতদরিদ্রদের দুই কোটি ৬৩ লাখ ছয় হাজার টাকার মধ্যে অর্ধেক টাকা প্রকল্প কর্মকর্তা কেটে রেখে অর্ধেক দিতে চান। চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে অর্ধেক টাকা অগ্রিম হাতে পেলে পুরো টাকা ছাড় করতে চান তিনি।

ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর চেয়ারম্যানরা হতদরিদ্র শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্ধেক টাকা নিয়ে নেবেন এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কোনো শ্রমিক চেয়ারম্যানদের টাকা না দিলে পরের মাসে তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে। এর আগেও এভাবে দরিদ্রদের অর্ধেক টাকা প্রকল্প কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগাভাগি হয়। এবারও সেই লোভে টাকাগুলো আটকে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যানরা বিলম্বে দিনমজুরদের তালিকা জমা দিয়েছেন। করোনায় ত্রাণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় দিনমজুরদের তালিকা ব্যাংকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ সঠিক নয়।

শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ৪০ দিনের কর্মসূচির শ্রমিকরা হতদরিদ্র। তাদের টাকা ছেড়ে দেয়ার জন্য আমি কয়েকবার বলেছি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। কিন্তু কেন তারা দিনমজুরদের টাকা আটকে রেখেছেন সেটা তারাই বলতে পারবেন। তবে ঈদের ছুটির পর এই বিষয়টি অবশ্যই দেখব। এসব গরিব মানুষের জন্য যা করার সবই করব আমি।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এএম/জেআইএম