ক্ষেতেই পচে গেছে পাঁচ লাখ টাকার সবজি, কাঁদছেন কৃষক
কষ্টের কথা বলে কি লাভ? কে নেবে কষ্টের ভার। সাংবাদিক ছাড়া কেউ আসেনি খোঁজ নিতে। সংবাদ করেও বা কি হবে। সরকারি লোকজন তো কখনও দেখতে আসে না। দেয় না কোনো সহায়তা। গত চার বছরে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে আমার। ক্ষতির কথা জানালেও কপালে জোটেনি সরকারি কোনো সহায়তা। কেঁদে কেঁদে জাগো নিউজের কাছে নিজের কষ্টের কথাগুলো বলেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের বুরুঙ্গী গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ।
প্রতি বছর বন্যায় কৃষিখাতে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হয়। বন্যা শেষে সরকারিভাবে দেয়া হয় সহায়তা। কিন্তু সেই সহায়তা চেয়ারম্যান-মেম্বার ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাগজ-কলমে থেকে যায়। পান না মাঠপর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। যারা পান তারা প্রতি বছর রুটিন অনুযায়ী পান। এর মধ্যেও রয়েছে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম।
গত চার বছর বন্যার কবলে পড়ে প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের বুরুঙ্গী গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদের। বিশাল অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়লেও গত চার বছরে তার ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো সহায়তা। প্রতি বছর বন্যায় ফসল হারিয়ে ধারদেনা করে আবার চাষাবাদ করেন। স্বপ্ন দেখেন ভাগ্য বদলের। কিন্তু আবারও ক্ষতির মুখে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যান আব্দুর রশিদ। গত চার বছর এভাবেই জীবন চলছে তার।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি অফিসে খোঁজ নিলে কৃষি কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যাদের তালিকা দেন তারাই সরকারি প্রণোদনা, সহায়তা ও কৃষি উপকরণ পান। অন্যরা এসব পান না। কৃষকদের তালিকা করেন জনপ্রতিনিধিরা।

কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, এবারের বন্যায় ক্ষেতের সব ফসল শেষ আমার। বন্যার পানিতে গত কয়েকদিনে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার পটল ও করলা ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার আগে প্রতি সপ্তাহে ২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতাম। কিন্তু বন্যা এসে সব নিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেল আমার স্বপ্ন।
তিনি বলেন, শুধু এবার নয়; গত চার বছরে বন্যায় প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে আমার। অথচ কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাইনি আমি। শুনি, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়। কারা দেয় আর কারা নেয় তা আমি জানি না। এবারই শেষ; আর সবজি চাষ করব না। সবজি চাষ করে আমাকে পথে বসতে হয়েছে। এখন সংসার চলবে কিভাবে ভেবে কান্না আসে আমার।
আব্দুর রশিদের মতো একই অবস্থা কচুয়া ইউনিয়নের বুরুঙ্গী গ্রামের বাবলু প্রধানসহ গাইবান্ধার কয়েক হাজার কৃষকের। লাভের আশায় সবজি চাষ করে পথে বসতে হয়েছে তাদের। তাদের খোঁজ নিতে আসেননি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জেলার কৃষি কর্মকর্তারা। বন্যায় ফসল হারিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন তারা।
কচুয়া ইউনিয়নের বুরুঙ্গী গ্রামের কৃষক বাবলু প্রধান বলেন, লক্ষাধিক টাকা খরচ করে করলা চাষ করেছি। যখন করলা তুলে বাজারে বিক্রি করে খরচ তুলব ভেবেছি তখন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেল করলাক্ষেত। খরচ তোলা তো দূরের কথা আমার পুঁজি শেষ। সরকারি সহযোগিতা পেলে সামনের বছর চাষাবাদ করতে পারব। না পেলে চাষাবাদ করা হবে না। আমি এ পর্যন্ত কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাইনি।
গত চার বছরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে জানতে কচুয়া ইউনিয়নের সদস্য (মেম্বার) আইয়ুব হোসেনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছাদেকুজ্জামান বলেন, এ বছর প্রথম দফার বন্যায় সাঘাটা উপজেলায় ২৫০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে দুই হাজার ৮৩৩ জন কৃষকের এক কোটি ১৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। দ্বিতীয় দফার বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। তবে দ্বিতীয় দফায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারিভাবে অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা নেই। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা দফতরে পাঠিয়েছি। সরকারি প্রণোদনা এলে কৃষকদের দেয়া হবে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, প্রথম দফার বন্যায় জেলার চার উপজেলায় এক হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি টাকা। ১৩ হাজার পাঁচজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দ্বিতীয় দফার বন্যায় প্রায় তিন হাজার ২০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিনামূল্যে রোপা আমনের চারা দেয়া হবে।
এএম/এমকেএইচ