সংসারের ঘানি কাঁধে নেয়া আসিক এখন পরিবারের বোঝা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ২০ আগস্ট ২০২০

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বিদ্যুতের খুঁটিতে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে আসিকের। হাত পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। তাই কৃত্রিম হাত-পা ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন আসিক।

জানা গেছে, নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের বামনপাড়া এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে আসিক আহম্মেদ (২১)। দরিদ্র পরিবার হওয়ায় বাবা-মায়ের বড় ছেলে হিসেবে তার ঘাড়েই সংসারের দায়িত্ব পড়ে। লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে পারেননি তিনি। ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর থেকেই সংসারের ঘানি টানতে শুরু করেন আসিক। দৈনিক মজুরিভিত্তিতে কাজ শুরু করেন কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নাগেশ্বরী জোনাল অফিসে। দিন রাত পরিশ্রম করে যা আয় হতো তা দিয়েই সংসার চালাতেন আসিক। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বিদ্যুতের খুঁটিতে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই হাত এবং ডান পা হারাতে হয় তাকে।

আসিক জানান, গত বছরের ২৬ নভেম্বর কাজের জন্য নাগেশ্বরী জোনাল অফিসে উপস্থিত হয়ে প্রতিদিনের মতো অফিস নির্ধারিত সার্ভিস অর্ডারভুক্ত হয়ে নেওয়াশী ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন সরকারের বাড়িতে সেচের নতুন সংযোগের মিটার ও ট্রান্সফর্মার উত্তোলন করতে যান। সে সময় আসিক কাজ শুরু করার আগে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ করতে অফিসের লাইন টেকনিশিয়ান তোজাম্মেল হককে জানান। কিন্তু লাইন বন্ধ করলেও আসিকের কাজ শেষ না হতেই, তার কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স না নিয়েই হুট করে বিদ্যুতের লাইন চালু করেন তোজাম্মেল। অমনি বিদ্যুতায়িত হয়ে গুরুতর আহত হন আসিক। পরে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজে নেয়ার পরামর্শ দেন।

এরপর আসিককে রংপুর মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তাকে দ্রুত ঢাকার বার্ন ইউনিটে রেফার্ড করা হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় তার দু’হাত এবং এক পা কেটে ফেলতে হয়। সেখানে চিকিৎসায় ব্যয় হয় প্রায় ৬ লাখ টাকা।

এসব গল্প বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেন আসিক। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার এই বিপদের পর অনেকেই সহযোহিতার আশ্বাস দিলেও এখনও কেউ সাড়া দেননি। যারা বড় বড় কথা বলেছেন তারা কেউ ফোনও রিসিভ করেন না। আর রীতিমতো এ দায় এড়িয়ে চলছেন নাগেশ্বরী জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আতিকুর রহমান, নেওয়াশী ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন, জুনিয়র ইঞ্জিনয়ার ওয়াজেদুল ইসলাম ওয়াজেদ, লাইন টেকনিশিয়ান তোজাম্মেল হোসেন ও লাইনম্যান আশিকুর রহমান। দুর্ঘটনার পর আসিকের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের আশ্বাসসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধা প্রদান করেন তারা।

এমনকি জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ওয়াজেদুল ইসলাম ওয়াজেদ, লাইন টেকনিশিয়ান তোজাম্মেল হক, লাইনম্যান আশিকুর রহমান মজুরি ভিত্তিতে কাজ করে নিলেও মাস শেষে পুরো মাসের টাকা উত্তোলন করে আসিককে অর্ধেক মাসের মজুরি দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন আসিক।

আসিকের বাবা রফিকুর ইসলাম বলেন, দিন নেই রাত নেই, ঝড়-বৃষ্টিতেও অফিসের লোকজন আসিককে ডাক দিয়ে নিয়ে যেত কাজের জন্য। লাইন বন্ধ থাকলে নাকি জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ওয়াজেদের চাকরি থাকে না। এইভাবে ডাক দিয়ে নিয়ে কাজে লাগায়। ওইদিনও খুব সকালে ওয়াজেদ আমার ছেলেকে ফোন করে ডেকে নিয়ে যায়। পরে খবর পেলাম ছেলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছে। ছেলের চিকিৎসা করাতে সব শেষ করে ফেলেছি। ছেলেও এখন আমার পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি এর বিচার চাই।

মা আনজিনা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে ওইদিন ষড়যন্ত্র করে কৌশলে এমনটা করা হয়েছে। যাদের কারণে আমার ছেলে আজ পঙ্গু আমি তাদের বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে তখন সদ্য বিবাহিত ছিল। এখন বউ অন্তঃসত্ত্বা। তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে জানি না। আমি তাদের ভবিষ্যৎ চাই।

এদিকে লাইন টেকনিশিয়ান তোজাম্মেল হক বলেন, আমাদের অফিস থেকে কাজে পাঠানো হলে সঙ্গে একজন করে শ্রমিক থাকে। ওইদিন আসিক কার সঙ্গে গেছে আমি জানি না। তাকে সাহায্য করেছি আমরা। আরও করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

লাইনম্যান আশিকুর রহমান বলেন, ঘটনার দিন তার সঙ্গে আমি ছিলাম না। সে আমার সঙ্গে কয়েক দিন কাজ করলেও সঙ্গে সঙ্গে টাকা পরিশোধ করেছি।

জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ওয়াজেদুল ইসলাম ওয়াজেদ বলেন, তাকে কে কাজে পাঠিয়েছে আমি জানি না। ওটি গ্রাহকের ক্রয় করা ট্রান্সফর্মার ছিল। তার ডাকে যেতে পারে।

গ্রাহক নেওয়াশী ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি সেখানে গেছি। ওইদিন যে তারা অফিস থেকে কাজে আসবে আমাকে জানানো হয়নি। আমি গিয়ে ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। তার জন্য সবার এগিয়ে আসা উচিৎ।

নাগেশ্বরী জোনাল অফিসের ডিজিএম আতিকুর রহমান বলেন, আসিক নিয়মিত আমাদের অফিসে কাজ করত। কিন্তু ওইদিন তাকে অফিসিয়ালি পাঠানো হয়নি। সে কেন গেল তা জানি না। দুই বার তার সহকর্মীরা তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। অফিসিয়ালি কিছুই করার নেই।

নাজমুল হোসেন/এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।