৫০ বছর ধরে দিনমজুরি করেন সয়ান আলী

আরিফ উর রহমান টগর
আরিফ উর রহমান টগর আরিফ উর রহমান টগর টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৬:৫১ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০২০

পাঁচ দশকের দিনমজুরিতেও সংসারের অভাব ঘোচেনি সয়ান আলী শেখের (৭০)। দাদা আর বাবার পথ অনুসরণ করে বেছে নেয়া দিনমজুরিতে এতদিন কোনোভাবে জীবন আর জীবিকা চালিয়ে আসলেও এখন বয়স আর অভাব-অনটনের কাছে পরাস্ত তিনি। এখন সরকারি আর ব্যক্তি সাহায্য-সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে চলছে তার পরিবার।

দিনমজুর সয়ান আলী টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাঘিল ইউনিয়নের ফৈলার ঘোনা গ্রামের মৃত আয়ান আলী শেখের ছেলে।

সয়ান আলী জানান, দাদা, বাবা আর তার উপার্জনে কোনো জমিজমা করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাদের তিন প্রজন্মেরই ঠিকানা দাদার বাবার গড়া বাড়ি। দাদার বাবার ছিল তিন ছেলে সন্তান। যার একজন তার দাদা বহর আলী শেখ। এই বাড়িতে বসবাস করে জমিজমা চাষাবাদ আর দিনমজুর করে সংসার চালিয়েছেন তার দাদা বহর আলী শেখ।

দাদার অভাব অনটনের সংসারেও জন্ম নেন তার বাবা আয়ান আলী শেখসহ তিন ছেলে সন্তান। দাদার বয়স বাড়ার কারণে দিনমজুরি করে সংসারের হাল ধরেন তার বাবা আয়ান আলী শেখসহ দুই চাচা। তাদের পরিশ্রমে টিনের এই ঘরটুকু যোগ হলেও বাড়েনি জমিজমা।

Tangail

বাবা আয়ান আলী শেখের ঘরে জন্ম নেন সয়ান আলী শেখসহ তিন ছেলে সন্তান। বাবার মৃত্যুর পর তাদের দাদার বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমিজমা ভাগ করে নেন সয়ান আলী শেখসহ তিন ভাই। ভাগ-বাটোয়ারায় সয়ান আলী শেখের জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ শতাংশের বাড়ি আর ১১ শতাংশ আবাদি জমি। সয়ান আলীর পাওয়া ওই সম্পত্তি আর দিনমজুরি করা সংসারে জন্ম নেয় তিন কন্যা সন্তান।

তিনি আরও জানান, আবাদি জমিতে নিজ পরিশ্রমে পাওয়া ফসল আর দিনমজুরি করে উপার্জিত টাকায় এক এক করে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার আনন্দ বেশি দিন দীর্ঘ হয়নি। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই বড় মেয়ের মৃত্যু আর তিন বছর আগে ছোট মেয়ের স্বামীর মৃত্যুর মত দুঃসংবাদ সইতে হয়েছে তাকে। সয়ান আলীর স্বামী-স্ত্রীর সংসারে বর্তমানে যোগ হয়েছে দুই সন্তানসহ স্বামীহারা ওই মেয়ে।

একদিকে বার্ধক্য অপরদিকে স্বামীহারা মেয়েসহ দুই সন্তানের লালন-পালনের ব্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দিনমজুর সয়ান আলী। এর মাঝে হানা দিয়েছে বৈশ্বিক মহামারি করোনা।

সয়ান আলী শেখ জানান, বয়সকালে মাটিকাটা আর কৃষিকাজ করতেন। এখন বয়স বাড়ার কারণে সব কাজ করতে পারেন না তিনি। তবে সংসারের প্রয়োজনে এখনও দিনমজুরি করেন। এখন ঠিক মত কাজ করতে না পারায় তার দিনমজুরি আড়াইশ থেকে তিনশ টাকা। পাশাপাশি মানুষের গরু বর্গা নিয়ে লালন-পালনও করেন তিনি।

দিনমজুর সয়ান আলী শেখ বলেন, করোনা আসার পর থেকে কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আড়াই হাজার টাকা আমি পাইনি। তবে এ সময় স্থানীয় বেশ কিছু ত্রাণ সহায়তা পেয়েছি। এই ত্রাণ সহায়তা না পেলে হয়তো মরতে হতো। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১০ টাকার চাল পাই। বয়স্কভাতার কার্ড হচ্ছে।

Tangail

সয়ান আলী শেখের অসুস্থ স্ত্রী বিমলা বেগম (৬০) বলেন, স্বামীর বয়স হয়েছে। সংসারে কোনো ছেলে সন্তানও নেই। এতে চরম কষ্টে চলছে আমাদের জীবন চলছে। ভাঙা এক টুকরো টিনের ঘরে স্বামী-স্ত্রীসহ স্বামীহারা মেয়ে ও তার দুই সন্তান নিয়ে এখন আমাদের বসবাস। করোনায় সকল প্রকার কাজ বন্ধ থাকায় গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে দেয়া বেশ কিছু ত্রাণ পেয়েছিলাম আমরা।

সয়ান আলী শেখের স্বামীহারা মেয়ে শরিফন বেগম (৩২) বলেন, তিন বছর আগে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আমার স্বামী মারা যান। বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে দিনমজুর বাবা সয়ান আলীর বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছি।

গ্রামের মাতব্বর আব্দুল খালেক (৬৫) বলেন, দিনমজুর সয়ান আলী শেখ অতিদরিদ্র ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি সয়ান আলী শেখের দিনমজুরি করে জীবনযাপন করেন। তার দাদা আর বাবাও এই দিনমজুর ছিলেন।

বাঘিল ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ফৈলার ঘোনা গ্রামের ইউপি সদস্য শামসুল আলম বলেন, হতদরিদ্র ও দিনমজুর সয়ান আলী শেখ আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে এখন ভালো মত দিনমজুরির কাজও করতেন পারেন না। এ কারণে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড করে দেয়াসহ তাকে বয়স্কভাতার কার্ড করে দেয়া হয়েছে।

বাঘিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সোহাগ বলেন, করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আড়াই হাজার টাকার জন্য এ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এক হাজার জনের নামের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। তবে ওই টাকার বণ্টন তালিকা উপজেলা পরিষদ থেকে পাঠানো হয়। এ ইউনিয়নের কতজন ওই তালিকায় ছিল সে তথ্যও আমাদের দেয়নি উপজেলা প্রশাসন।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান আনছারী বলেন, বাঘিল ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের পাঠানো তালিকা থেকে ৫৭০ জনের নাম পাঠানো হয়েছিল। করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া আড়াই হাজার টাকা এর মধ্যে কতজন পেয়েছেন তা আমি জানি না।

আরএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।