বিলে অবৈধ বাঁধ, চাষের অনুপযোগী ৩০০ হেক্টর জমি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০২০

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়ার শঙ্কায় এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে তা নিশ্চিত করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় প্রায় তিনশ হেক্টর কৃষি জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

মূলত একটি বিলে অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে কচুরিপানা আটকে অন্তত চার হাজার কৃষকের জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ এবং মাছের অবাধ বিচরণেও ব্যাঘাত ঘটছে ওই বাঁধের কারণে।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রতি হেক্টর জমিতে ছয় মেট্রিক টনেরও বেশি ধান উৎপাদন হয়। সেই হিসেবে বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়া জমিগুলোতে প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। যার বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদ ও রূপসদী ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে থাকা বাড়িয়াদহ বিলটি দুই বছর আগে স্থানীয় ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির নামে তিন বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। সমিতির সদস্য পিছন দাসের নামে নেয়া ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর কাছে বিলটি সাব ইজারা দেয়া হয়।

jagonews24

সাব ইজারাদাররা মাছ চাষের জন্য বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দেন বিলে। আর ওই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে কৃষকদের প্রায় তিনশ হেক্টর ফসলি জমি তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি বিভাগ।

সরেজমিনে বাড়িয়াদহ বিলে গিয়ে দেখা গেছে, মাছ চাষের জন্য অবৈধভাবে বিলের কয়েক কিলোমিটার অংশজুড়ে বাঁশ ও জাল দিয়ে বাঁধ দিয়েছেন সাব ইজারাদাররা। এই বাঁধের ভেতরেই মাছ চাষ করা হচ্ছে। আর বাঁধের কারণে বিল সংলগ্ন প্রায় তিনশ হেক্টর জমিতে কচুরিপানা আটকে আছে। এতে কৃষকরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। বাঁধ দেয়ার আগে বিলে বিভিন্ন নৌযান চললেও এখন আর কোনো নৌযান চলাচল করতে পারছে না।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছেন, এক কানি (৩০ শতাংশ) জমি থেকে কচুরিপানা সরাতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই টাকা টাকা খরচ করে কচুরিপানা সরানোর সক্ষমতা নেই অধিকাংশ কৃষকের। জমিতে চাষাবাদ করতে না পেরে কোনো কোনো কৃষক বিলে মাছ ধরতে গেলে তাদের বাধা দেন ইজারাদাররা।

রূপসদী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাত্তার মিয়া জানান, বাড়িয়াদহ বিলের পাশে তার আড়াই কানি কৃষি জমি রয়েছে। প্রতি মৌসুমে এই জমি থেকে প্রায় ৫০ মণের মতো ধান গোলায় তোলেন তিনি। কিন্তু বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে তার সব জমি এখন কচুরিপানার নিচে। আর তাই এবারের মৌসুমে ধান চাষ করতে পারেননি তিনি।

jagonews24

ফরদাবাদ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মামুন মিয়া বলেন, বিলের পাশে আমার ১৫ কানি জমি আছে। আমার এই জমিতে প্রায় তিনশ মণ ধান হয়। শুধু এই বাঁধের কারণে কচুরিপানা আটকে আমাদের জমি এখন চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যদি বাঁধ না দিতো তাহলে কচুরিপানা আমাদের জমিতে থাকতো না, বিলে চলে যেতো। এখন আমাদের কৃষকদের মরার মতো অবস্থা।

ফরদাবাদ গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, মাছ চাষ করে তারা, আর ক্ষতি হয় আমাদের। তারা আমাদের এই ক্ষতি দেখে না। এই অবৈধ বাঁধের কারণে সব জমিতে কচুরিপানা ভরে গেছে। আমাদের দাবি এই বাঁধ ভেঙে দিয়ে জমিগুলো চাষের উপযোগী করে দেয়া হোক।

ফরদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ সেলিম বলেন, সাব ইজারাদারদের দেয়া বাঁধের কারণে কৃষকের জমিতে এসে কচুরিপানা জমা হয়। আর কৃষকরা কচুরিপানা পরিষ্কারও করতে পারেন না, ধানও চাষ করতে পারেন না। গত দুই বছর ধরে এই অবস্থা চলছে। কৃষকরা বিলে মাছও ধরতেও পারেন না। এতে করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফরদাবাদ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সকহারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইসমাঈল হোসেন সুজন বলেন, বিলে বাঁধ দেয়ার কারণে প্রায় তিনশ হেক্টর জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই জমির ওপর চার হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে। সেজন্য দ্রুত বাঁধটি অপসারণ করে জমিগুলোকে চাষের উপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।

jagonews24

মূল ইজারাদার ও ফরদাবাদ-রূপসদী ধীবর সমবায় সমিতির সদস্য পিছন দাস বলেন, বিগত মৌসুমে কৃষকরা ধান চাষ করেছেন। এবার জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা আমরা পরিষ্কার করে দেবো।

এদিকে সাব ইজারাদারদের পেশীশক্তির কাছে নিরুপায় কৃষকরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। দ্রুত সাব ইজারাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এ ব্যাপারে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন সারোয়ার বলেন, আমরা ইজারা নেয়া মৎস্যজীবী সমিতিকে সময় দিয়েছি। নির্দিষ্ট ওই সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ করার পাশপাশি কৃষি জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কার করার জন্য বলা হয়েছে। যদি নির্দিষ্ট করে দেয়া সময়ের মধ্যে বাঁধটি অপসারণ এবং কচুরিপানা পরিষ্কার না করা হয়- তাহলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।