মা-ইলিশ শিকারে কৌশলী জেলে বেপরোয়া ব্যবসায়ী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি চাঁদপুর
প্রকাশিত: ০৩:৫১ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০২০

চাঁদপুরে প্রশাসনের অভিযানের পরও বন্ধ হয়নি মা-ইলিশ শিকার। সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রজনন মৌসুমে একশ্রেণির অসাধু জেলে প্রতিনিয়ত নদীতে মাছ শিকারে নামছেন। আইন অমান্য করার প্রবণতার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার প্রভাবশালী মহলের তৎপরতায় মা-ইলিশের নিধনযজ্ঞ চলছেই। ফলে এ বছর পর্যাপ্ত ইলিশ প্রাপ্তি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জেলা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্যরা ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর পযর্ন্ত মোট ৬৬টি অভিযান চালিয়ে ১০০ জেলেকে আটক করে। এদের মধ্যে ৮৪ জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন। বাকি ১৬ জনকে মোট ৪২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে ৭০৯ কেজি ইলিশ ও ১৬.৬১ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মোট ২৬টি মামলা হয়েছে।

ইলিশের প্রজনন মৌসুম হিসেবে ১৪ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞার আওতায় চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, মজুত, ক্রয়-বিক্রয় ও সরবরাহ নিষিদ্ধ করা হয়। কেউ আইন অমান্য করলে এক থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে জেলা টাস্কর্ফোসের ১০টি টিম নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার আশপাশের চরাঞ্চলে যেন মাছ ধরার উৎসব শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জেলেরা। জেল-জরিমানা এমনকি সরকারি নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই অবাধে চলছে ইলিশ নিধন। জেলেরা দিন-রাত পালাক্রমে ইলিশ শিকার করছে। অসাধু মাছ ব্যবসায়ীরা কৌশলে গ্রামের বিভিন্ন ঝোপ-জঙ্গলে কিংবা হাট-বাজারে অবাধে বিক্রি করছে ইলিশ। অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ীরাও। আইনি ঝামেলা এড়াতে মা-ইলিশ বিক্রি ও ধরার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদের।

chadpur

রোববার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আনন্দবাজার, সফরমালি, খেরুদিয়া, বাংলাবাজার, বিষ্ণুপুর, রাজরাজেস্বরসহ বিভিন্ন স্থানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকাশ্যে বিক্রি করছে জাটকা ও মা-ইলিশ। এদিন নদীতে ১৬টি অভিযান চালিয়ে ১১৮ কেজি মা-ইলিশসহ ৪৭ জেলেকে আটক করা হয়। এসময় ৯.০৪ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। আটকদের মধ্যে ৩৯ জন জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। বাকি আট জেলেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামানের নেতৃত্বে পদ্মা-মেঘনায় অভিযান চালানো হয়। অভিযান চলাকালে চাঁদপুর পুরান বাজার রনাগোয়াল এলাকার কাছে এলে জেলা প্রশাসনের স্পিডবোট লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়। এছাড়া অসাধু জেলেরা নৌকায় করে দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলার প্রস্তুতি নেয়। একপর্যায়ে নিরাপত্তার কথা ভেবে সেখান থেকে চলে আসে অভিযানকারী দল।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, রাতভর ইলিশ শিকার হচ্ছে প্রজনন এলাকাজুড়ে। অনেক এলাকায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ শিকারে নতুন পন্থা নিয়েছে অসাধু জেলেরা। জেল-জরিমানা থেকে বাঁচতে ইলিশ শিকারে এখন তারা শিশুদের ব্যবহার করছে। কারণ বয়সের বিবেচনায় শিশুদের দণ্ড দিতে পারছে না প্রশাসন।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকী জানান, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্থানে কিছু অসাধু জেলে মাছ শিকার করছে। নদীতে সর্বদাই কাজ করছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। এছাড়া কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছে। তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত নদীতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জেলেকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। প্রতিদিন জেলা টাস্কর্ফোসের ১০টি টিম নদীতে পালাক্রমে অভিযান পরিচালনা করছে।

চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, পানি বেশি থাকায় খুব সহজেই নদীতে নামা জেলেরা চরের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়ছে। এছাড়া তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে। বেপরোয়া জেলেরা এখন হামলা করতেও দ্বিধা করছে না। আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে একটু বাড়তি দায়িত্ব পালন করলে মা-ইলিশ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হবে।

এনএফ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]