তিন পুরুষ না পারলেও ছেলের ভাগ্য বদলাতে চান আল আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ১২:৫৭ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০২০

কৃষক আল আমিনের বয়স ২৮ বছর। তিন পুরুষ ধরে কৃষিকাজই তাদের মূল পেশা। মাত্র ১২ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে হাল কাঁধে নিতে হয় তাকে। বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া এক টুকরো জমি থাকলেও প্রতিনিয়ত পরিবারের সদস্যদের অন্নের সন্ধানে বিকল্প কর্মের সন্ধানে ছুটে চলেছেন তিনি। তারপরও দেড় যুগে হয়নি ভাগ্যের পরিবর্তন।

আল-আমিনের বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের ঘুকরাপাড়া গ্রামে। তার বাবা মমতাজ আলী প্রামানিক ও মা ছারা বেগম। বাবা ছিলেন কৃষক ও মা গৃহিণী। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আল-আমিন সবার ছোট।

১৯৯২ সালে আল-আমিনের জন্মের সময়ই তার মা ছারা বেগম মারা যান। মা হারা আল আমিন বেড়ে ওঠেন বোনের কোলে। বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করেন। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ায় তাকে ৫ম শ্রেণিতেই লেখাপড়ার ইতি টানতে হয়।

আল-আমিনের কর্মজীবন শুরু মাত্র ১২ বছর বয়সে। জীবিকার তাগিদে কলম ফেলে হাতে তুলে নিতে হয়েছে জীবিকা অর্জনের হাতিয়ার। যে বয়সে তার বই খাতা নিয়ে লেখাপড়া করার কথা ছিল, সমবয়সীদের সঙ্গে হৈ-হুল্লড়ে মেতে থাকার কথা ছিল সেই বয়সে জীবিকার সন্ধানে মাঠে থাকতে হয়েছে তাকে।

আল আমিনের বাবা মমতাজ আলী ছিলেন একজন প্রান্তিক কৃষক। তার ৩ বিঘা ফসলি জমি ছিল। মমতাজ আলী বেঁচে থাকতে হালচাষ করেই অভাব অনটনের মাঝে দিন কাটিয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন করতে পারেননি।

তিনি ৬ ছেলে-মেয়েকেও ভালো কোনো কর্মের সংস্থান করে দিতে পারেননি। কলুর বলদের মতো মাঠে কাজ করতে হয়েছে তাদের। ধীরে ধীরে অভাবের তাড়নায় নিঃস্ব হয়েছে তার পরিবার। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মতো বাবার পথ ধরে কৃষি কাজের পাশাপাশি আল আমিন নানা পেশার কাজ করেও জীবন বদলাতে পারেননি।

তার দাদা করিম বক্স প্রামানিকও ছিলেন একজন কৃষক। তার ছিল ৫ বিঘা জমি। তার তিন ছেলে সন্তান। সবার ছোট আল-আমিনের বাবা মমতাজ আলী। দাদা, বাবা আর তার উপার্জনে কোনো বাড়তি জমি যোগ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাদের তিন প্রজন্মেরই ঠিকানা বাপ-দাদার গড়া বাড়ি।

jagonews24

খেতের মধ্যে কথা হয় আল-আমিনের সঙ্গে। বললেন কৃষি কাজ করে বাবা, দাদা এমনকি তিনিও ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারেননি।

‘আজ লেখাপড়া জানা থাকলে হয়ত জীবনে উন্নতি করতে পারতাম। আমি লেখাপড়া না করলেও লেখাপড়ার মর্ম আমি বুঝি। তাই আমার একমাত্র ছেলে মোরছালিনকে (৮) স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। তাকে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ করে তুলব। আমার মতো ছেলেকে আমি কৃষি কাজে নিয়োজিত করব না।’

বর্তমানে এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে আল আমিনের অভাবের সংসার। তিনি কখনও নির্মাণ শ্রমিক আবার কখনও দিনমজুরের কাজ করেন। এছাড়া গবাদিপশু পালন করেন।

পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া এক বিঘা জমির ফসল দিয়ে তার পরিবারের ভরণপোষণ হয় না। তাই তাকে ভিন্ন পেশায় কাজ করতে হয়। তবুও তার ভাগ্যের উন্নতি হচ্ছে না। গত দেড় যুগ ধরে কৃষক হিসেবে একাধিকবার কাজের ধরন বদলালেও বদলায়নি তার অর্থনৈতিক অবস্থা। এক বেলা খেয়ে, অন্য বেলা না খেয়ে দিন কাটছে আল আমিনের পরিবারের।

জানালেন, ভোরে ঘুম ভাঙে তার। দু’মুঠো অন্নের সন্ধানে প্রভাতের মায়াবী আলোয় বেরিয়ে পড়েন তিনি। মাথায় পাহাড়সম ভাবনা। বেলা বেড়ে গেলে কাজ পাবেন না। কাজ না পেলে উপোষ থাকতে হবে। এ চিন্তা এখন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এভাবেই প্রতিদিনের জীবন যুদ্ধ চলছে আল আমিনের।

উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিপ্লব হোসেন বলেন, আল-আমিন শ্রমজীবী মানুষ। একজন কৃষক। তিনি প্রতিদিন প্রচুর পরিশ্রম করেন। কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও তার জীবনে কোনো উন্নতি আসেনি। তবে সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও কারো কাছ সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি তিনি।

এফএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]