কেউ ‘উৎকোচে’ ভরে নিচ্ছেন ট্যাংকি, লাইনে দাঁড়িয়েও পাচ্ছেন না অনেকেই

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬
পাম্পগুলোতে দেখা গেছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ছবি: জাগো নিউজ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেল নিয়ে এক ধরনের তেলেসমাতি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না- এমন খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে একটি অসাধু চক্র অতিরিক্ত দামে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের তীর মূলত জ্বালানি তেলের ডিলার ও কিছু পেট্রোল পাম্প স্টেশনের কর্মচারীর দিকে।

সরকার বলছে, দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে অদূর ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে না- এমন গুজবে আতঙ্কিত হয়ে কেউ যেন অতিরিক্ত তেল মজুত না করেন, সেজন্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার (রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে ৫ লিটার), প্রাইভেটকারে ১০ লিটার, মাইক্রোবাস বা পিকআপে ২৫ লিটার এবং বাস বা ট্রাকে সর্বোচ্চ ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি নেওয়া যাবে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এখন শুধু দিনেই নয়, গভীর রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঘুসের বিনিময়ে গোপনে কিছু গাড়ির ট্যাংকি পূর্ণ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে লাইনে থাকা সাধারণ গ্রাহকদের অনেকেই তেল না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

নরসিংদী থেকে ছলিমগঞ্জ পর্যন্ত নৌরুটে চলাচলকারী একাধিক লঞ্চ মালিক এ প্রতিবেদককে জানান, এই রুটে প্রতিদিন দুবার যাতায়াতে প্রতিটি লঞ্চের জন্য প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। তারা সাধারণত নরসিংদীর সাটিরপাড়া এলাকার পেট্রোল পাম্প থেকে নিয়মিত ডিজেল সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ আবার ছলিমগঞ্জ বা অন্য ডিলারের এজেন্টদের কাছ থেকেও ডিজেল কিনে থাকেন।

লঞ্চ মালিকরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে নরসিংদীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে নিয়মিত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কখনও সরবরাহ সংকটের কথা বলে তেল দেওয়া বন্ধ রাখা হচ্ছে, আবার কখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম দেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক লঞ্চ মালিক জানান, বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে নরসিংদী–ছলিমগঞ্জ রুটে যাত্রীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এক সময়ের লাভজনক এই লঞ্চ ব্যবসা এখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে।

তিনি বলেন, সাধারণত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা- এই দুই ঈদে বাড়ি ফেরা যাত্রীর সংখ্যা বেশি থাকে। আর মাত্র কয়েকদিন পরই ঈদ। গত ৯ মার্চ তিনি ২০০ লিটার ডিজেল প্রতি লিটার ১২৫ টাকায় কিনেছেন, যেখানে সরকারের নির্ধারিত দাম প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা। ফলে তাকে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার টাকা বেশি গুনতে হয়েছে।

অতিরিক্ত দামে তেল কেনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ লিটার তেল লাগে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে কিছু তেল রিজার্ভে রাখতেও হয়। বেশি দামে তেল না কিনলে লঞ্চ বন্ধ রাখতে হতো। কিন্তু লঞ্চ বন্ধ থাকলেও কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি বেশি দামে তেল কিনেছেন।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আহরার হোসেন নামে এক গণমাধ্যমকর্মী লেখেন, তার ড্রাইভার রাজধানীর একটি ফিলিং স্টেশনের কর্মচারীকে ৫০০ টাকা ঘুস দিয়ে পুরো ট্যাংকি ভর্তি তেল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রোলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের বড় একটি অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি থেকে প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। অথচ দেশে পেট্রোল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা মাত্র ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধে সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।

অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, চোরাচালান এবং বাজার অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা প্রতিরোধে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারি পদক্ষেপ

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা

জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সারাদেশে বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবৈধ মজুতদার, অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি

অতিরিক্ত তেল কেনা রোধে সরকার সীমিত পরিমাণে জ্বালানি বিক্রির ব্যবস্থা চালু করেছে। এর আওতায় মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার এবং প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ১০ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ক্রয় রেকর্ড ও মনিটরিং

ফিলিং স্টেশনগুলোকে জ্বালানি বিক্রির রসিদ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তীবার তেল নেওয়ার সময় আগের রসিদ দেখাতে বলা হতে পারে। ডিলারদের বরাদ্দ অনুযায়ী তেল সরবরাহ ও বিক্রির হিসাব যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চোরাচালান রোধে নজরদারি

সীমান্ত এলাকায় তেল চোরাচালান ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। নিয়মিত ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে তেল পৌঁছানো হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল না কেনার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এমইউ/এএমএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।