ঘুমের ঘোরে এখনো শুনতে পাই জয় বাংলার প্রতিধ্বনি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী
প্রকাশিত: ১১:৩৪ এএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০২০

মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত দিনগুলোর উত্তাল তরঙ্গ আজও হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরে শুনতে পাই মেশিনগানের শব্দ, মর্টারের আওয়াজ ও জয় বাংলার প্রতিধ্বনি- যুদ্ধের স্মৃতি মনে করতে গিয়ে এগুলো বলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নোয়াখালীর বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া।

যুদ্ধের সময় তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের জন্য নোয়াখালীর ছাত্র যুবকদের উদ্বুদ্ধ করে ট্রেনিংয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা, দেশের ভেতরে তাদের থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করাই ছিলো তার অন্যতম দায়িত্ব।

মুজিববাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেক্টর প্রধান শেখ ফজলুল হক মনি, উপপ্রধান আ স ম আবদুর রব, জেলা মুজিববাহিনীর প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েত ও রাজনৈতিক সমন্বয়কারী মোস্তাফিজুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি ও তার সঙ্গীরা ৬৬ বার ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করেন। পাক-হানাদারবাহিনীর কড়া নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন স্থানে ও ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতেন তিনি। এ সকল স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বার বার চোখে পানি এসে পড়ছিল তার।

গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বীরমুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক। তিনি ১৯৫১ সালের নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নাটেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষকামতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৃত মৌলভী মোকসেদুর রহমান ভূঁইয়া ও মাতা মৃত আনঞ্জুমের নেছা। তিনি বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন এবং চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগে যোগদানের মধ্যে দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। তিনি ১৯৭০ সালে বেগমগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালনের সময়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশহগ্রহণ করেন। প্রথমে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যান। মুক্তিযুদ্ধে তিনি আহম্মেদ সুলতান (বজরা) বি এল এফ (মুজিববাহিনী)’র নোয়াখালী অঞ্চলে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহকারীর দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে তিনি জাসদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং জেলা-উপজেলা ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তিনি একজন সফল সংগঠক হিসেবে পরিচিত।

তিনি সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও নাটেশ্বর ইউনিয়ন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তার এক মেয়ে ও ছয় ছেলে রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময়ের অনেক ঘটনার মধ্যে একটি ঘটনা আজও আমার মনে দাগ কাটে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছিলাম সেদিন। ১৯৭১ সালের মধ্য আগস্টের একটি মেঘলা দিনে আগরতলা হতে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য রওনা দেই। বেলা ৪টা অথবা ৫টার দিকে গুনবতি রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশ দিয়ে রেললাইন পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। একটু দূরেই গুনবতি রেল স্টেশনের গোডাউনে পাক-আর্মি ও মিলিশিয়ার ক্যাম্প ছিল। হঠাৎ আমাদের কানে আওয়াজ ভেসে আসল ‘দুশমন যাতা হ্যায়, দুশমন যাতা হ্যায়’। এটা শুনে আমরা পাশের গ্রামে ঢুকে পড়ি। তবে পাঞ্জাবি আর মিলিশিয়াদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও রাজাকার ও শান্তি-কমিটির লোকজন আমাদেরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে এবং তারপর আমাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমরাও নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুনছি।

তবে সৌভাগ্য যে আমাদের বন্দি করার সংবাদটি তখনো পাকসেনা ক্যাম্পে পৌঁছায়নি। আমরা ছিলাম ক্লান্ত,ক্ষুধার্ত ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। নিশ্চিত মৃত্যু আমাদের কপালে। শত শত লোক আমাদের দেখতে সমবেত হয়েছিল। আমরা বাঁচার জন্য আকুতি করছি এবং ভয়ে কাঁপছি। এরই মাঝে হঠাৎ একটা নাম শুনতে পাই ‘লিডার কুতুব ভাই’ আসুক।

এ কুতুব উদ্দিন হলো ফেনীর লাকসাম এলাকার রাজাকার কমান্ডার। সে রাজাকার কমান্ডার হয়েও গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা করত। মূলত সে ছিল খাজা আহম্মদ ও শেখ ফজলুল হক মনির অনুগত লোক। ইতোমধ্যেই কুতুব উদ্দিন আমাদেরকে হালকা নির্যাতন ও গালমন্দ করে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। ছাড়া পেয়ে আমরা গভীর রাতে কানকিরহাটের দক্ষিণ হাটিরপাড়ে (ছাচুয়া গ্রাম) প্রাক্তন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডা. নুরুজ্জামান চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে চিকিৎসা নেই।

স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এসে তিনি বলেন, অনেকে স্মৃতিই এখন বিস্মৃতি হয়ে গেছে। এরই মধ্যে রনাঙ্গনের অনেক সাথীকে হারিয়েছেন। তাদের কথা এখনো মনে ভেসে। এখনোও যারা জীবিত আছেন আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে তারাও চলে যাবেন না ফেরার দেশে। মুক্তিযুদ্ধের যে অর্জন তা সংরক্ষণ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে হলে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কারণ কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি জানান, ৪৯ বছরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি যে কম তা বলা যাবে না। তবে আমরা চেয়েছিলাম শোষনহীন সমাজ, ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত দেশ ও সমধিকার। আমরা জাতীয় পতাকা, স্বাধীন সত্ত্বা, একটি সংবিধান পেয়েছি। আর এর কৃতিত্ব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

একই সাথে তিনি আরও জানান, স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এসে দেশের যে উন্নয়ন হয়েছে এবং আরো হবে তার বেশিরভাগেরই অবদান বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার যোগ্য নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলছে।

মিজানুর রহমান/এসএমএম/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।