উত্তেজনার মধ্য দিয়ে শৈলকুপায় ভোট শুরু

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝিনাইদহ
প্রকাশিত: ০৮:৪১ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২১

চরম আতঙ্ক আর উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর নির্বাচন। কুমার নদের তীরে অবস্থিত এ পৌরসভার নির্বাচন সুষ্ঠু করতে শহরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মোড়ে মোড়ে রয়েছে পুলিশ চেকপোস্ট। ভোটারদের মাঝে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা থাকলেও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) থেকেই শৈলকুপা পৌর এলাকায় ১৫ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও দুইজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে দুই প্লাটুন বিজিবি, চারশ পুলিশ এবং ১৩৫ জন আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে শৈলকুপা পৌসভার নির্বাচনের ৮নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী আলমগীর হোসেন খাঁন বাবুর নিহত হওয়ার ঘটনায় পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে

নির্বাচনের দুদিন আগে বুধবার (১৩ জানুয়ারি) রাত ১টার দিকে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কুমার নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

একই রাতে পাঁচ ঘণ্টা আগে নিহত আলমগীরের সমর্থকদের হমালায় প্রতিপক্ষ কাউন্সিলর প্রার্থী লিয়াকত হোসেন বল্টু (৫৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়। নিহত লিয়াকত হোসেন একই ওয়ার্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেনের ভাই। এসব ঘটনার পর থেকে পৌরবাসীর মধ্যে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত হোসেনের ছোট ভাই আওয়ামী লীগ কর্মী বল্টু হত্যার ঘটনায় ২০ জনকে আসামি করে শৈলকুপা থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় বাপ্পি নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ

সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার বিকাল ৩টায় ভোটগ্রহণের জন্য কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন পৌঁছে গেছে। পৌর এলাকার ৯ ওয়ার্ডের ১৫ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারদের হাতে ইভিএমসহ ভোটের অন্যান্য সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। নির্বাচন অফিস থেকে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা জুয়েল আহমেদ প্রিজাইডিং অফিসারদের হাতে এসব সামগ্রী তুলে দেন।

নির্বাচনে মেয়র পদে চারজন, কাউন্সিলর পদে ৩৬ ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ৯টি ওয়ার্ডের ২৮ হাজার ৬৩২ জন ভোটার ১৫টি কেন্দ্রের ৯২টি কক্ষের মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তবে সব কেন্দ্রই ঝুকিপূর্ণ বলছে প্রশাসন।

চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস কবলিত এ উপজেলার পৌর নির্বাচনে অভ্যন্তরীন গ্রুপিং-দ্বন্দের মধ্য দিয়ে চলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা। নির্বাচনের তফশীল ঘোষণার পর থেকে দলীয় মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে প্রায়ই ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘটিত ছোট-বড় সংঘর্ষে অন্তত দুই জন নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে ৩৫ জন নেতা-কর্মী। তারপরও পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে সরগরম ছিল পৌর এলাকা।

এদিকে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাতীয় সংসদ সদস্য আব্দুল হাই নৌকা প্রতীকে ভোট চাওয়ায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী খলিলুর রহমান ও আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী তৈয়বুর রহমান।

প্রচারণার শেষ দিনে বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) বিকালে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজনের নির্বাচনী অফিসে উপস্থিত জনতার কাছে নৌকা প্রতীকে ভোট চান সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। এই নিয়ে নির্বাচন অফিসে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে এর প্রতিকার দাবি করেন তারা।

নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনিত প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র কাজী আশরাফুল আজম। আশরাফুল আজম তৃতীয় বারের মতো পৌর নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেলেন। এদিকে মাঠে রয়েছে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র খলিলুর রহমান।

এছাড়া নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী তৈয়বুর রহমান খান। দলেল সিদ্ধান্ত অমান্য করায় বিদ্রোহী প্রার্থী তৈয়বুর রহমানকে পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক থেকে বহিষ্কার করে দল। আরেকদিকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টি প্রার্থী আবু জাফর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগ থেকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে শৈলকুপা উপজেলা আওয়ামী লীগ। যার এক পক্ষের নেতৃত্ব দেন সদ্য প্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শিকদার মোশাররফ হোসেন।

অপর পক্ষের নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক মোস্তফা আরিফ রেজা মন্নু। সে বিভক্তির প্রভাব পড়ছে পৌর নির্বাচনেও।

পৌরসভায় দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন যুগ্ম পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আশরাফুল আজম, সদ্য প্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনের ছেলে উপজেলা যুবলীগের সহ-সভপতি শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু ও পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তৈয়বুর রহমান খান।

কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান কাজী আশরাফুল আজম। এরপর দলের সিদ্ধান অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে (স্বতন্ত্র) নির্বাচন করছেন তৈয়বুর রহমান খান। আর দলীয় চাপে সরে দাঁড়ান শিকদার ওয়াহিদুজ্জামান ইকু।

এরপর গত ৩ ডিসেম্বর বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত বহিষ্কৃত পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জগ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈয়বুর রহমান খান ও মেয়র প্রার্থী আশরাফুল আজম তার সমর্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এসময় ইট ও পাথরের আঘাতে কমপক্ষে সাত পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এ বিষয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কাজী আশরাফুল আজম বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে কোন্দলের কোনো বিষয় নেই। সবাই এক হয়ে কাজ করছি। এখানে এক জন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। দলীয়ভাবে বোঝানোর পরও সে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ানোয় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এছাড়া দেশের বড় দল বিএনপির স্থানীয় কমিটি গঠন ও নেতৃত্ব নিয়ে নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক কোন্দল ও গ্রুপিং চলছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ফলে একা হয়ে পড়েছে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতা সাবেক মেয়র খলিলুর রহমান। দলটির পক্ষে তিনি একক প্রার্থী। তবে প্রচারণায় মাঠে পাচ্ছেন না নেতা-কর্মীদের।

দলের এমন অবস্থায় বিএনপি প্রার্থী খলিলুর রহমান বলেন, কোন্দল এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আওয়ামী লীগ থেকে দুজন প্রার্থী মাঠে রয়েছে। আর বিএনপি থেকে আমি একা ভোটের মাঠে। ফলে সঠিক নির্বাচন হলে আমি জয়ী হবো ।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ/এসএমএম/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]