বায়ুদূষণ বাড়ছে গাজীপুরে, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্য

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাজীপুর
প্রকাশিত: ০৩:০৯ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২১

গাজীপুরে সারাবছর ধরেই চলছে যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। এসব উন্নয়ন কাজে পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় তার জন্য নির্দেশনা থাকলেও এর বাস্তবায়ন নেই। এছাড়া শিল্পকারখানা ও ইটভাটার ধোঁয়াসহ ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়ার আগ্রাসনে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

এ কারণে বায়ুদূষণ এখন গাজীপুরের সব শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে বড় বড় নির্মাণ কাজ চলায় সর্বত্রই এখন ধুলাবালি।

বায়ু দূষণের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কতটুকু বাড়ছে এমন প্রশ্নের জবাবে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক তপন কান্তি সরকার বলেন, প্রতিদিনই হাঁচি-কাশি নিয়ে রোগী আসছে। অ্যাজমা-অ্যালার্জি, সাইনোসাইটিস, গলাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতসহ নানা ধরনের রোগী আসছে। বায়ুদূষণ এর বড় কারণ বলে তিনি মনে করেন।

গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গাজীপুরের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কে গত তিন-চার বছর ধরে চলছে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ। ওই কাজের জন্য চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতে ব্যাপক ধুলাবালির সৃষ্টি হচ্ছে। ধুলাবালির কারণে ওই পথে চলাচলকারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বিআরটি প্রকল্পের কাজের সময় সড়কে পানি ছিটানোর কথা থাকলেও পানি ছিটানো হচ্ছে খুবই কম। যার কারণে ধুলাবালিতে একাকার হয়ে যাচ্ছে পুরো এলাকা।

jagonews24

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ সড়ক ধরে এগোলে টঙ্গী স্টেডিয়ামের সামনে, টঙ্গী স্টেশন রোড এলাকা, বোর্ডবাজার এলাকাসহ মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের সামনেও চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। আরেকটু সামনে কুনিয়া বড়বাড়ি থেকে মালেকের বাড়ি, চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত একই অবস্থা। গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে চান্দনা চৌরাস্তা জাগ্রত চৌরঙ্গী ভাস্কর্য পর্যন্ত সড়কে ধুলাবালিতে কুয়াশার মতো অবস্থা হয়ে আছে।

গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় দেড় হাজার পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য ছোট-বড় প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। রাস্তার পাশে দোকানপাট, রিকশা যাত্রী ও পায়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এসব শিল্প কারখানার দূষিত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে আশপাশের খাল-বিলে। এতে করে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে একই সঙ্গে বায়ুদূষণ হচ্ছে। দূষণ রোধে গাজীপুরে হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প কারখানা ‘গ্রিন কারখানা’ হিসেবে ঘোষণা করলেও বেশির ভাগ শিল্পকারখানা থেকে মারাত্মকভাবে পরিবেশ ও বায়ুদূষণ হচ্ছে।

চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান বলেন, দোকানের সামনে আধা ঘণ্টা বসে থাকেন, দেখবেন সড়কের কাজের ধুলাবালিতে আপনাকে আর চেনার উপায় থাকবে না। শুনেছি কাজের সময় পানি দেয়ার কথা কিন্তু পানি দিতে দেখা যায় খুব কম সময়ই। এছাড়া সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত রাস্তায় পানি ছিটানো হয় না।

তিনি আরও বলেন, রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ১২ কিলোমিটার অংশে ধুলার জন্য বের হওয়া যায় না।

বাসন এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত আলী জানান, গাজীপুরের বায়ুদূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। সব সময় নাক-মুখ ঢেকে চলাফেরা করতে হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটের কাজ হচ্ছে কিন্তু প্রয়োজন মতো পানি ছিটানো হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় গত বছর ১৭৪টি ইটভাটা ছিল। যথাযথ আইন প্রয়োগের কারণে গত বছরই এসব ইটভাটা জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতর অভিযান চালিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। যার কারণে এবছর সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো ইটভাটা নেই। কিন্তু কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও সদর উপজেলায় এখনো ইটভাটা রয়ে গেছে। এসব ইটভাটার বেশিরভাগই আবাসিক এলাকায়। আবার কিছু ইটভাটা করা হয়েছে দুই বা তিন ফসলি চাষের জমির পাশে। এসব এলাকার বাসিন্দাদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগও দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

jagonews24

কালীগঞ্জ এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক নূর মোহাম্মদ জানান, তাদের এলাকায় এখানো ২০-২৫টি ইটভাটা রয়েছে। এগুলোর বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় গাছপালা মরে যাচ্ছে। ফলের গাছ গুলোতে এখন আর আগের মতো ফল ধরছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) গাজীপুর আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক হাসান খান বলেন, ইটভাটার যে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করার কথা, অনেকেই তা করছেন না। ফলে বাতাসে কার্বন মিশে বায়ুদূষণ ঘটছে। গাজীপুরে অনেক ইটভাটা বায়ুদূষণ করছে। তা ছাড়া কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, ব্যাটারি তৈরির কারখানা ও স্টিল কারখানাও বায়ু দূষণে ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন, এগুলো আইনের লঙ্ঘন। স্থানীয় লোকজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে প্রতিকার চাইতে পারেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত এসব দূষণের বিরুদ্ধে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া। তা ছাড়া যারা দূষণ করছে, তাদের সচেতন করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ সংগঠনের উদ্যোক্তা ও গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন কলকারখানার নির্গত দূষিত বাতাস, বিভিন্ন রাস্তার চলমান উন্নয়ন কাজ, যত্রতত্র ময়লার ভাগাড়, অসংখ্য ইটভাটা বায়ুদূষণের জন্য অন্যতম। তবে কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নিলে এ দূষণ কমানো যেতে পারে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আ. সালাম সরকার বলেন, সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাসমান ক্ষতিকর বস্তুকণা এখনকার বাতাসে বিরাজ করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত রাস্তার বিআরটি প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ, চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ফ্লাইওভার নির্মাণ, ব্রিজ-কালভার্ট, লেন বৃদ্ধি, কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারসহ জেলার বিভিন্ন অংশে রাস্তাঘাট নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় নির্মাণ কাজে সৃষ্ট ধুলাবালি বাতাসে মিশছে। রাস্তাঘাটে নিয়ন্ত্রণহীন খোঁড়াখুঁড়ি ও অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ বন্ধের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি করলে ফল পাওয়া যাবে।

মো. আমিনুল ইসলাম/এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।