এ যেন মানুষ বিক্রির হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক খুলনা
প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১

করোনা মহামারি সংক্রমণ রোধে দেশে চলছে লকডাউন। এ সময়ে সাধারণ মানুষের বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে চলাচলে রয়েছে বিধিনিষেধ। যানবাহন চলাচলে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। তবুও জীবিকার তাগিদে শ্রমজীবী মানুষ ছুটে চলছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়।

সোমবার (১৯ এপ্রিল) সকাল ৭টা থেকে ৮টার দিকে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া উপজেলা সদরে হাতে-পিঠে ব্যাগ, পুঁটলা বাঁধা মানুষের ভিড় দেখা যায়। এরা খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রান্তিক অঞ্চল থেকে কাজের সন্ধানে আসা অভাবি মানুষ।

বছরের বৈশাখ মাসের শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত বোরো ধান কাটার এ সময় শ্রমজীবী মানুষের চাহিদা ডুমুরিয়া এলাকায় অনেক বেশি। তবে করোনা মহামারির এই সময়ে প্রতি শুক্র ও সোমবারে ডুমুরিয়া বাজারের কালিবাড়ী মোড়ে শ্রম বিক্রির হাটে (স্থানীয় ভাষায় কিষেন হাট) মানুষের ভিড় হচ্ছে অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

এই শ্রম বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সম্প্রতি করোনা সংক্রমণ রোধে হাটবাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি হাটটি ডুমুরিয়া কলেজ মাঠে স্থানান্তরিত করেছে।

শত শত শ্রমজীবী মানুষ হাটে আসেন বিক্রি হতে এবং উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গৃহস্ত মানুষ কৃষিকাজের জন্য তাদের কিনে নেন। চলতে থাকে অন্যান্য পণ্যের মতো দর-কষাকষি। সকালবেলা চাহিদা বেশি থাকে। শ্রমজীবীরা দামও বেশি পান। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে চাহিদা কমে যায় এবং দামও কমে আসে।

স্থানীয়ভাবে শ্রমজীবীদের বলে ‘দিনমজুর’, আবার কেউ বলে ‘কামলা’ বা ‘কিষেন’। ১৮ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে ৭৫ বছরের বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সের শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে দলে দলে ছুটে আসেন এ হাট।

এ মানুষগুলোর বেশিরভাগই হতদরিদ্র শ্রমজীবী। ক্রেতাদের কাছে তারা কেউ কেউ এক সপ্তাহ আবার কেউ কেউ একমাস চুক্তিতে ধান ক্ষেতে রোপণ, পরিচর্যা ও ধান কাটা, সবজি চাষাবাদের জন্য বিক্রি হন। আমন-বোরো ক্ষেত চাষাবাদের সময় এ অঞ্চলে দিনমজুর বা কৃষিকাজের মানুষের বরাবরই অভাব থাকে।

সোমবার (১৯ এপ্রিল) সরেজমিনে ডুমুরিয়া কলেজ মাঠে গিয়ে দেখা গেল, অন্তত চার হাজার শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি। শ্রমিক ক্রেতার গৃহস্তের সংখ্যাও অনেক। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাসহ প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা চুক্তিতে শ্রম বিক্রি হচ্ছে। তবে শ্রম কেনা মালিকের পছন্দের ওপর নির্ভর করে শ্রমের মূল্য। বৃদ্ধের চেয়ে জোয়ানদের চাহিদা বেশি। তবে অনেকে শরীরের গঠন দেখেও ক্রয় করেন। এ যেন পণ্য বিক্রির হাট।

বিক্রি হতে আসা শ্রমজীবী মানুষ যেদিন নিজেকে বিক্রি করতে না পারেন, সেদিন তাদের রাত কাটে বাজারের কাছাকাছি মসজিদ, মাদরাসা অথবা স্কুলের বারান্দায়। কখনো থাকেন আধা পেটে, কখনো উপোস। সকাল থেকেই ফের বিক্রি হওয়ার আশায় শুরু হয় ছোটাছুটি বলে শ্রমজীবীরা জানান।

বাজারে বিক্রি হতে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলকার বয়োবৃদ্ধ আমজু মিয়া জানান, কৃষিকাজেই ব্যয় হয়েছে তার যৌবনকাল। এ সময়টায় অবসরে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে এখন ডুমুরিয়া হাটে।

এখানে শ্রম বিক্রির জন্য জড়ো হয়েছেন তার মতো আরও শত শত অভাবী মানুষে। অমেদ আলী ফকির (৭০) খুলনার কয়রা উপজেলার কৈখালী গ্রামের বাসিন্দা। চার ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র ছেলে স্থানীয় একটি মাদরাসায় লেখাপড়া করে। অভাবের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জমিজমাও তেমন নেই। বর্গাচাষ করেই চলে সংসার। কিন্তু করোনা মহামারিতে অভাবে পড়ে বর্গাচাষও করতে পারেননি। ঘরে খাবার নেই। এলাকায় কাজও নেই। তাই কাজের সন্ধানে তিনি হাটে এসেছেন। তিনি আরও জানান, তার ঘরে পাঁচজন মানুষ, শরীরও খারাপ। তারপরও অভাবের তাড়নায় কাজের খোঁজে এসেছেন। এখানে মানুষ বেশি, কাজ পাওয়া যায় বেশি। তার দুঃখ বৃদ্ধ হওয়ায় অনেকেই তাকে কাজে নিতে চান না।

কাজের সন্ধানে আসা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার এলাকার আবুল খায়ের, মনোয়ার হোসেন, আবদুল করিম বলেন, এসময় গ্রামের বাড়িতে কোনো কাজকর্ম নেই। তাই এ অঞ্চলে কাজের সন্ধানে তারা ছুটে এসেছেন।

আলমগীর হান্নান/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]