সিমেন্টের বস্তায় তৈরি ঝুপড়িতে দিন কাটছে মতি-রাশিদার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ০৮:২৫ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২১

ঘর নেই, তাই সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশের তৈরি ছাপড়ার নিচে দুই বছর ধরে থাকছেন এক দম্পতি। অসহায় মতি ব্যাপারী (৩০) ও রাশিদা বেগম (২৫) দম্পতির ঝুপড়ির নিচে দুই বছর পার হলেও তাদের ভাগ্যে আজও জোটেনি সরকারি কোনো সাহায্য বা ঘর।

দুই শতাংশ জমির আর সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন ঘেরা ঝুপড়িটিই তাদের একমাত্র সম্বল। এই দম্পতির সংসারে আছে এক ছেলে রবিউল ব্যাপারী (৭) ও এক মেয়ে মরিয়ম (৩)। খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছে অভাগা মতি-রাশিদা দম্পতির। তাদের বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চন্দনকর গ্রামে।

কথা হয় অসহায় মতি ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ২২ বছর বাবা-মার সঙ্গেই ছিলেন তিনি। তার বাবার নাম কাবিল ব্যাপারী। মা মাসুদা বেগম। তারা সাত ভাই, দুই বোন। তিনি ভাই বোনদের মধ্যে পঞ্চম। ২০১৪ সালে তিনি একই ইউনিয়নের সুবচনী চরমালগাঁও গ্রামে বিয়ে করেন। নিজের পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় বিয়ের পর নিজ বাড়িতে যায়গা হয়নি। তাই বিয়ের পর পরিবার নিয়ে দুই বছর শ্বশুর বাড়িতে থেকেছেন তিনি। পরে সেখানে যায়গা না হওয়ায় ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও এলাকার মঙ্গল খাঁর বাড়িতে থাকতেন। এর মাঝেই জন্ম হয় ছেলে রবিউল ও মেয়ে মরিয়মের। ওই বাড়িতে চার বছর থাকার পর বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে পরিবার নিয়ে আবার বাপ-দাদার ভিটেয় এসে ওঠেন মতি ব্যাপারী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মতি ব্যাপারীর অসহায়ত্বের কথা জানতে পারেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান। পরে শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনদীপ ঘরাইকে খোঁজ নিতে বলেন। বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) সকালে ইউএনও মতি ব্যাপারীর বাড়িতে যান। তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।

মতি ব্যাপারী জাগো নিউজকে বলেন, আমি মাটি কাটা শ্রমিক। বিয়ের আগে বাবার ঘরে ছিলাম। বিয়ের পর থাকার যায়গা না থাকায় অন্যের বাড়ি বাড়ি ছিলাম। আমি গরিব, টাকার অভাবে ঘর তুলতে পারিনি। বাবার কাছ থেকে দুই শতাংশ জমি পেয়েছি। সেখানেই সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশে ঘেরা ছাপড়ার নিচে দুই বছর ধরে আছি। ঝড় তুফান হলে আমার ঘরটি উড়ে যাবে।

তিনি বলেন, ইউএনও স্যার আমাদের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে যদি একটি ঘর দিতো তাহলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে দিন কাটাতে পারতাম।

তিনি আরও বলেন, আমার বাবা কৃষক। তাই আমাদের পড়াশোনা করাতে পারেনি। আমি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। অভাবের সংসার, অভাবেই কাটছে।

jagonews24

বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে ঝুপড়ি তুলেছেন মতি ব্যাপারী। ছাপড়ার ভেতরে ছোট একটি বৈদ্যুতিক ফ্যান ঘুরছে। পাশেই মশারি, পুরোনো দুটি বালিশ। নিচে হোগলা পাতার বিছানা, তাও ছেঁড়া। ছাপড়ার পূর্ব পাশে খোলা রান্না ঘর। পাশেই অন্যের একটি পুকুর। নেই কোনো টিউবওয়েল।

মতির স্ত্রী রাশিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে বলেন, সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে থাকি। এমন ঘরে থাকা যায় না। ঝর বৃষ্টি হলে কোন দিকে যাব দিশা পাই না।

মতির বৃদ্ধা মা মাসুদা জাগো নিউজকে বলেন, আমরা গরিব। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিক্ষা দিতে পারি নাই। আমার ছেলে মতির ঘর নাই। কাগজ দিয়া ঘর উঠাইয়া থাকে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতে অনেক কষ্ট হয়। একটি ঘর খুবই দরকার।

ওই গ্রামের বাসিন্দা খালেক ব্যাপারী, হারুন ব্যাপারীসহ অনেকেই বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমিহীন ও দুস্থ অসহায়দের বাড়ি করে দিলেও তাদের ভাগ্যে ঘর জোটেনি। কেউ খোঁজ নেয় না তাদের। সরকারের পক্ষ থেকে মতিকে যদি একটি ঘর দিতো তাহলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতে পারতো।

রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মজিবর রহমান খোকন বলেন, আমার কাছে মতির পরিবার কখনো আসেনি। আমি তার পরিবারকে ভিজিএফ কার্ডের ব্যবস্থা করে দেবো। যতটা সম্ভব সহযোগিতা করবো।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনদীপ ঘরাই বলেন, সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে জেলা প্রশাসক স্যার ওই অসহায় পরিবারটির ব্যাপারে জানতে পারেন। তখন আমাকে খবর নিতে বলেন। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারটির পাশে গিয়ে যা দেখলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘর আমরা যাদের দিচ্ছি, এই পরিবারের চেয়ে ভালো সিলেকশন আর হতে পারে না। পরিবারটি পলিথিন মোড়ানো যায়গায় থাকছে। আমি তাদের এতটুকু আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেছি, আগামী এক মাসের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে উপহার আছে, অর্থাৎ ঘর, সেই ঘরে আপনারা উঠতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, আপাতত সংসদ সদস্যর সঙ্গে পরামর্শক্রমে টিন দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। কারণ, সামনে বৃষ্টি ও কাল বৈশাখী ঝড়। তখন এই পরিবারের কী অবস্থা হবে। ইতোমধ্যে তাদের যে যায়গাতে ঘর দেয়া হবে, সেই যায়গার মাটির কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে ঘরের কাজ শুরু করা যাবে আশা করা যাচ্ছে।

মো. ছগির হোসেন/এমআরআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]