শামসুন্নাহারের জীবনই যেন আজীবনের সংগ্রাম
মোছা. শামসুন্নাহার (৬০)। গায়ের রঙ কালো হওয়ায় তার গর্ভে সন্তান রেখে চলে গিয়েছিলেন স্বামী। জনসমর্থন নিয়ে একসময় ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন নারী ইউপি সদস্য হিসেবে। কিন্তু সেই সুখ আর তার কপালে টেকেনি। এখনো একমাত্র অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে চলছে তার সেই যুদ্ধ। মানুষের সহায়তা নিয়ে কোনো রকমে অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা খরচ ও জীবন যাপন করছেন শামসুন্নার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কাইতলা ইউনিয়নের মধ্যপাড়ার কৃষক আব্দুল আজিজের ৪ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মোছা. শামসুন্নাহার দ্বিতীয়। পড়ালেখা করেছেন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত।
১৯৭৮ সালে পারিবারিকভাবে ব্যাংক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমানের (বাচ্চু) সাথে বিয়ে হয় শামসুন্নাহারে। কিন্তু গায়ের রঙ কালো হওয়ার অজুহাতে বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই স্বামী মুজিবুর রহমান সংসার করা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। এক পর্যায়ে শামসুন্নাহার গর্ভবতী হওয়ার ৮ মাসের মাথায় বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন তার স্বামী। এরপর থেকে স্বামী আর কোনো খোঁজ খবর রাখেননি।
স্বামী মুজিবুর রহমান ১৯৮২ সালে তাকে তালাক না দিয়ে আবার দ্বিতীয় বিয়ের কথা জানতে পারেন শামসুন্নাহার। অথচ শামসুন্নাহারের গর্ভে জন্ম নেওয়া ছেলের খোঁজ পর্যন্ত নেননি ব্যাংক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বাচ্চু।
এরপর থেকে শুরু হয় একমাত্র ছেলে আরমান সুমনকে নিয়ে শামসুন্নাহারের জীবন যুদ্ধ। বাবা-মায়ের কাছে ১৪ মাসের ছেলেকে ফেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে এসে যোগ দেন একটি এনজিওর চাকরিতে। এরই মাঝে ছেলে তার নানা-নানির কাছে বড় হতে থাকে।
ছেলে যখন ৫ম শ্রেণির ছাত্র তখন শামসুন্নাহার চাকরি ছেড়ে সন্তানসহ বাবার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের টিউশনি করে কোনো রকম খরচ চালাতে থাকেন। এর কয়েক বছর পর স্থানীয়রা শামসুন্নাহারকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারী ইউপি সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহ দেন। পরে পরিবারের সদস্যদের সম্মতি নিয়ে ১৯৯৮ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন।
নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণের ফলে নিজ এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। এরই মাঝে একমাত্র ছেলে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন।
শামসুন্নাহারের সুখের দিন সবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই সুখ টেকেনি তার। কোম্পানিতে চাকরিকালীন ছেলে আরমান প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। চিকিৎসা শুরু করা হয় তার। কিন্তু কী কারণে অসুস্থ হয়ে যান, চিকিৎসকরা তা শনাক্ত করতে পারেননি।
এক পর্যায়ে সেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের দাতিয়ারায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন শামসুন্নাহার। কারণ কয়েকদিন পর পর ছেলের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হচ্ছে।
আপন ভাইয়েরাও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। একভাই ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন, এক ভাই বেসরকারি চাকরিজীবী। কিন্তু শামসুন্নাহারের পাশে এই দুর্দিনে কোনো আত্মীয় স্বজন দাঁড়াননি। কোনো প্রকার সহায় সম্পদ না থাকার পরও গত প্রায় একযুগ ধরে মানুষের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে একপ্রকার যুদ্ধ করে ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন শামসুন্নাহার।
বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া দুই শতাংশ জায়গা বিক্রি করে ছেলেকে ভারত পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসকরা ছেলের রোগ শনাক্ত করতে পারেননি। বুকে ব্যথা ও দিন দিন শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে তার।
আরমান সুমনের বয়স বর্তমানে ৪০ বছর হলেও ওজন মাত্র ৩৫ কেজি। তাদেরকে সহায়তা করে যাচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত। বিগত একযুগ ধরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ও বিভিন্ন জায়গা থেকে সাহায্য নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
মোছা. শামসুন্নাহার জাগো নিউজকে বলেন, গায়ের রঙ কালো বলে স্বামী ছেড়ে চলে যায়। সে আমার কথা না ভাবুক, আমার গর্ভে জন্ম নেওয়া তার ছেলের কথাও ভাবেনি। আমার জীবনই এখন সংগ্রামের। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অভিযোগ করার পর সে আমাকে আইনতভাবে তালাক দিয়েছে। কিন্তু তার সন্তানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। এমনকি তার হক পর্যন্ত দেয়নি। আমি এখন নিরুপায়, ভেবে পাচ্ছি না ছেলের চিকিৎসা কিভাবে চালিয়ে যাব।
তিনি আরও বলেন, মানুষের কাছে হাত পেতে, সহয়তা নিয়ে বেঁচে আছি। ছেলেটি অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে টিউশনি করত। কিন্তু এখন লকডাউনের কারণে বন্ধ রয়েছে। তার বন্ধুরাও মাঝে মাঝে সহায়তা করেন। বাড়ির মালিকও অনেক ভালো মানুষ, তিনিও সহায়তা করেন। অ্যাডভোকেট নিশাত আপা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার অবদান সবচেয়ে বেশি।
শামসুন্নাহারের ছেলে আরমান সুমন জাগো নিউজকে বলেন, আমার রোগ কী তা চিকিৎসকরা শনাক্ত করতে পারেননি। প্রতিমাসে চিকিৎসায় আমার ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়াও বাসা ভাড়া আছে। আমার মা এই বৃদ্ধ বয়সেও কষ্ট করে যাচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত শামসুন্নাহারকে চিনি। যখন তিনি এনজিওতে চাকরি করতেন, তখন থেকে তার সাথে পরিচয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। গায়ের রঙ কালো হওয়ায় স্বামী ছেড়ে চলে যায়, এখন ছেলেকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন। তাদের পাশে সবার দাঁড়ানো উচিৎ। তার স্বামীর উচিত ছেলের প্রাপ্ত সম্পদ বুঝিয়ে দেয়া, তাহলে হয়তো ছেলেটির চিকিৎসা করাতে সহায়ক হবে।
আবুল হাসনাত মো. রাফি/এফএ/জিকেএস