মৌলভীবাজার

কাঁটাতার ও সড়কের অভাবে সীমান্তে বেপরোয়া চোরাচালানিরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০২:৩৮ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬

মৌলভীবাজারের পাঁচ উপজেলার প্রায় ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে প্রতিনিয়ত অবৈধ পণ্য ও মাদক প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চল, সীমান্তে কাঁটাতারের অভাব এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে চোরাকারবারিরা রাতের আঁধারে ভারত থেকে নানা পণ্য বাংলাদেশে পাচার করছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক ও চোরাইপণ্য জব্দ করলেও বিভিন্ন প্রতিকূলতায় অবৈধ অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় ভারতের পক্ষ থেকে তাদের অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা আছে। একইসঙ্গে তাদের সীমান্তের পুরো এলাকায় রাস্তা নির্মাণ করা আছে এমনকি দুর্গম এলাকায়ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে। সীমান্তের একেবারে কাছে গাড়ি নিয়ে সহজেই যেতে পারে বিএসএফ।

অপরদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে নেই কোনো কাঁটাতার ও যোগাযোগের জন্য রাস্তা। সীমান্তের অনেক জায়গায় বিজিবি সদস্যদের ক্যাম্প থেকে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় সীমান্ত এলাকায়। এসব এলাকায় রয়েছে ঘন জঙ্গল। সীমান্তে কাঁটাতার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হলে বিজিবি কোনোভাবেই অবৈধ মাদকদ্রব্য, পণ্যসহ বিভিন্ন চোরাই মাল অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না।

বিজিবি-৫২ সূত্রে জানা যায়, গত এক বছর ২ মাসে ১৭২টি অভিযান পরিচালনা করে বিজিবি। এসব অভিযান থেকে ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকার মূলের পণ্য জব্দ করা হয়।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার পাঁচটি উপজেলার সঙ্গে ভারতের সীমানা রয়েছে ২৭১ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার। বিশাল এই সীমানার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার সীমান্তের দায়িত্বে বিজিবি-৪৬ ব্যাটালিয়ন। জুড়ি ও বড়লেখা উপজেলার দায়িত্বে বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়ন। এই পাঁচটি উপজেলা দিয়ে নিয়মিত চোরাইপণ্য, ইয়াবা, মদ মাদকদ্রব্য, নিষিদ্ধ সিগারেট, বিড়ি, মহিষ, গোলাবারুদ, কাপড়, মোবাইলের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য নিয়মিত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে ও ভোরে চোরাকারবারিরা এগুলো পাচার করে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর বিজিবির চোখে পড়লে আটক করা হয়। নয়তো সারাদেশে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

কাঁটাতার ও সড়কের অভাবে সীমান্তে বেপরোয়া চোরাচালানিরা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্তের নিরাপত্তার জন্য বিজিবি সবসময় কাজ করছে। অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে যা ক্যাম্প থেকে ২-৩ ঘণ্টার রাস্তা। এর মধ্যে বেশিরভাগ জায়গা দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গল। ভারতের সীমান্ত তারা কাঁটাতার দিয়ে সংরক্ষণ করেছে। একই সঙ্গে তাদের সীমান্তে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভালো। আমাদের বাংলাদেশেও সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া খুবই প্রয়োজন। আমাদের কিছু সীমান্ত এলাকা আছে যেখানে হেঁটে যাওয়াই যায় না। নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে সীমান্তে কাঁটাতার ও সড়ক নির্মাণ করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাহলে সহজেই ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে কিছু ঢুকতে পারবে না। সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা চৌকিতে বিজিবির সদস্য সংখ্যা ও টহল বাড়ানো হয়েছে। তারপরও অবৈধ পণ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। আমরা যতটুকু সম্ভব অবৈধ পণ্য জব্দ করে থানায় হস্তান্তর করি।

কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বিড়ি, সিগারেট, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য আসে। প্রতিদিন রাতে ও ভোরো এগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সীমান্ত এলাকা থাকায় রাতের বেলা মানুষের চলাচল একেবারেই কম থাকে। এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে বাংলাদেশি ও ভারতের কিছু মানুষ জড়িত। তাদের বিশাল টিম আছে। বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা না থাকলেই কয়েক মিনিটে এগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক সময় সীমান্তের নদীপথে চোরাই মাল বাংলাদেশে আনা হয়।

বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসইউপি মো. আতাউর রহমান বলেন, সীমান্তে কাঁটাতার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। যদিও এটি অনেক ব্যয়বহুল। তবুও এটি প্রয়োজন। আমাদের অনেক সীমান্ত এলাকা আছে যেখানে পৌঁছানো অনেক কষ্টকর। সিলেট বিভাগের জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, জুড়ি, বড়লেখা, কুলাউড়াসহ বেশকিছু সীমান্ত এলাকা আছে যা দুর্গম। এই সুযোগে এসব সীমান্ত দিয়ে বেশি অবৈধভাবে বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। নির্বাচনের আগে বড়লেখা উপজেলার নিউ পাল্লাথল বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকা থেকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার করেছি যা ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। সীমান্তে যদি কাঁটাতার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতো তাহলে এগুলো এতো সহজে নিয়ে আসা সম্ভব হতো না।

এম ইসলাম/এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।