মাকে নিয়ে নতুন ঘরে থাকা হলো না আনসারের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ০৮:৪৯ পিএম, ১২ মে ২০২১

সংসারে অভাব, তাই বিদ্যালয়ে পড়া হয়নি আনসার মিয়ার। ছয় বছর বয়সে বাবার সঙ্গে নড়িয়া উপজেলার একটি ইটের ভাটায় কাজ করত। বাবা-ছেলের আয়ে সংসার চলে না তাই আনসারে বয়স যখন আট তখন পরিবারসহ ঢাকার মীরহাজিবাগ চলে যান।

সেখানে বাবা রঙের কাজ করতেন। আর মা, ভাই-বোনেরা একটি স্টিলের কারখানায় কাজ শুরু করেন। সংসারের সেজো ছেলে আনসার মিয়া। বর্তমানে আনসারের বড় ভাই মানসুর মাদবর (২৫) বিয়ে করে ঢাকাতেই ভিন্ন থাকেন। বাবাও এখন কাজ করতে পারেন না। তাই সংসারে একমাত্র উপার্জিত ছেলে আনসার মিয়া।

বলছিলাম, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কালিকাপ্রসাদ (মল্লিক বাড়ির ঢোন) গ্রামের গিয়াসউদ্দিন মাদবরের (৫০) ছেলে আনসার মিয়ার (১৪) কথা।

বুধবার (১২ মে) ভোরে ঢাকা মীরহাজিবাগ থেকে বোন নয়ন তারা ও সহকর্মী সবুজকে নিয়ে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আনসার। সকাল আটটার দিকে শিমলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাংলাবাজার ফেরি থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীর চাপাচাপি পায়ের পাড়াতেই আনসার মিয়ার মৃত্যু হয়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার সেজো বোন নয়ন তারা (১৭)। নয়ন তারাও অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পরেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে।

বাড়িতে আহাজারি করতে করতে আনসারের মা নাসিমা বেগম (৪০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা পরিবার নিয়ে ঢাকা থাকতাম। লকডাউনের কারণে কাজ কম থাকায় তিন মাস আগে স্বামীকে নিয়ে আমি শরীয়তপুর নিজ বাড়িতে চলে আসি।

আমার তিন ছেলে, এক মেয়ে। দুই মেয়ে বিয়ে দিছি। আমার ঘর ছিল না। গ্রামে আসলে কোনো রকম একটি জরাজীর্ণ ঘরে স্বামী ও সন্তান নিয়ে থাকি। তাই গ্রামে এসে ঋণ করে একটি দোচালা টিনের ঘর তুলি। সেই ঋণ পরিশোধ করছিল আনসার।

সেই ঘরে আজ আনসারকে নিয়ে প্রবেশ করব ভাবছিলাম। কিন্তু ফেরি থেকে নামতে গিয়ে যাত্রীর চাপাচাপিতে আনসার মারা গেছে। আমি কাকে বাবা বলে ডাকবো?

আনসারের বাবা গিয়াস উদ্দিন মাদবর বলেন, গত রোববার আনসার ফোন দিয়ে বলে বাবা তোমার লুঙ্গী কিনছি। আমি বলি বাবা আমার জন্য লুঙ্গী কিনতে হবে না। তুমি বাড়িতে চলে আস। আহারে আজ দুনিয়া থেকেই চলে গেল ছেলেটা।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আনসারের সহকর্মী সবুজ বলেন, আমার বাড়ি বরিশাল। আনসারের সঙ্গে একসাথে কাজ করি। বাড়িতে যাব বলে আজ আনসার, তার বোন নয়ন তারা ও আমি শিমলিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে ওঠি।

ফেরিতে যায়গা ছিল না। মানুষ আর মানুষ। মানুষের চাপাচাপিতে ফেরি থেকে নামতে গিয়ে আনসার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন ফেরির ফ্লোরে পড়ে যায়। মানুষের পায়ের পাড়াতে আনসারের মৃত্যু হয়।

শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিরাজ হোসেন জানান, ছেলেটি নামার সময় ভিড়ের চাপে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। উদ্ধার করে ছেলেটির লাশ তার বাড়িতে পাঠিয়েছি।

শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অবনী শংকর কর বলেন, বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি। আমি পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি।

মো. ছগির হোসেন/এমআরএম/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]