ভেজা ধানেই খোরাকির খোঁজ
সোনালি ধানে ভরে উঠেছিল মাঠ। বাতাসে ধানের দোল খাওয়া দেখে কৃষকের ছিল স্বপ্ন ছোঁয়ার আশা। কিন্তু সেই ধান অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ডুবে গেছে। অনেকে কিছু ভেজা ধান কেটে স্তূপ করে রাখলেও এখন আর তা তেমন কোনো কাজে আসবে না। তারপরও এই ধান হাতছাড়া করতে নারাজ কৃষকরা। আকাশে রোদ দেখামাত্র তা শুকাতে দিয়েছেন। অন্তত বছরের খোরাকির ব্যবস্থা করতে প্রাণান্তর চেষ্টায় আছেন তারা।
বুধবার (৬ মে) বহু প্রত্যাশিত সেই রোদের দেখা মেলে। আর এতেই শত দুঃখের মাঝেও যেন একটু সুখ খোঁজার চেষ্টা কৃষকদের। রোদ দেখে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা ভেজা ও পচন ধরা ধান শুকানোর প্রাণান্তকর চেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রোদের দেখা পাওয়া মাত্রই কৃষকরা ভেজা ধান খলায় (ধান শুকানোর মাঠ) নাড়তে শুরু করেছেন। পরিবারের সব সদস্য মিলে যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন, সেখানেই ধান শুকাতে চেষ্টা করছেন। কেউবা রাস্তা, কেউ খলা, কেউ বাড়ির উঠানে ধান নাড়ছেন। প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কিছু ধান শুকিয়ে যেন বছরের খাওয়ার উপযোগী করা যায়।
‘এবার ধান অনেকটা সোনার মতো হয়ে উঠেছে। সোনার উচ্চ দামের কারণে মানুষ শুধু দেখে, কিনতে পারে না, ধরতে পারে না। অথচ দেখুন ধান পানির নিচে চলে গেছে। এটিও ধরতে পারে না, আনতে পারে না। এনেও কোনো লাভ হবে না। বিক্রি করতে পারবে না, খেতেও পারবে না’—ভুক্তভোগী কৃষক
কৃষকরা বলছেন, এবার ধান বিক্রি করার মতো নেই। জমির ধান জমিতেই পড়ে আছে। সব পানির নিচে চলে গেছে। যা কিছু কেটে আনা হয়েছে, সেগুলোও পচতে শুরু করেছে। কিছু ধানে চারা গজিয়ে গেছে। এগুলো বিক্রি করা যাচ্ছে না।
রাস্তায় ভেজা ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক। ছবি-জাগো নিউজ
বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের বাসিন্দা শোয়েব চৌধুরী জানান, এবার তিনি ২০ কেদার (প্রতি কেদার ৩০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু কাটতে পেরেছেন মাত্র তিন কেদার জমির ধান। বাকি ধান পানিতে তলিয়ে আছে।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক আগেই হাওরে পানি চলে এসেছে। বৃষ্টিপাতও হয়েছে অনেক বেশি। নদীগুলোর পানিও বেড়ে হাওরে প্রবেশ করেছে। ফলে আধাপাকা অবস্থাতেই ধান পানির তলে চলে গেছে। বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারার ভয়েও ধান কেটে আনতে পারিনি।’
‘আমি ছয় কেদার জমিতে আবাদ করেছিলাম। এখন দুই কেদার জমির ধানও কাটতে পারবো কি-না জানা নেই। অন্তত বছরের খোরাকিটা তুলতে পারি কি-না তার চেষ্টায় আছি’
আক্ষেপ করে এই কৃষক বলেন, ‘এবার ধান অনেকটা সোনার মতো হয়ে উঠেছে। সোনার উচ্চ দামের কারণে মানুষ শুধু দেখে, কিনতে পারে না, ধরতে পারে না। অথচ দেখুন ধান পানির নিচে চলে গেছে। এটিও ধরতে পারছি না, আনতে পারছি না। এনেও কোনো লাভ হবে না। বিক্রি করতে পারবো না, খেতেও পারবো না।’
ভেজা খড় শুকানোর পর স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ছবি-জাগো নিউজ
একই উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাসিন্দা জিতেন্দ্র সরকার বলেন, ‘ধান সব পানির নিচে চলে গেছে। দু-এক কেদার জমির ধান কাটতে পারলেও গত কয়েকদিন টানা বৃষ্টির কারণে শুকাতে পারিনি। দুইদিন ধরে কিছু রোদ দেখা দেয়ায় পচা ধানই শুকানোর চেষ্টা করছি। বিক্রি নয়, খাওয়ার উপযোগী ধানতো বের করতে হবে, সেই চেষ্টায় আছি।’
আরও পড়ুন:
হাওরাঞ্চলে স্বস্তির রোদে ধান নিয়ে ব্যস্ত কৃষক
দুর্যোগ-দরপতনে দিশাহারা কৃষক
উৎসবের মাসে বিষাদের ছায়া
হাওরজুড়ে হাহাকার, ধান কাটছে ‘নয়নভাগায়’
পানির নিচে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
‘মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
স্বপ্নের ধান পানির নিচে দেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কৃষক
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের বাসিন্দা গাজিউর রহমান বলেন, ‘কয়েকটা দিন সময় পেলেই মানুষ অধিকাংশ জমির ধান কেটে আনতে পারতো। কিন্তু প্রকৃতির ওপর তো কারও হাত নেই। কিছুই করার নেই। গতকাল (সোমবার) ও আজ (মঙ্গলবার) রোদ পাওয়ায় কিছু ধান শুকাতে পেরেছে মানুষ। পানির নিচের ধান কেটেই কী করবে? এটিতো দু-একদিন থাকলেই পচতে শুরু করে। চারা গজিয়ে যায়। শুকাতে না পারলে তো অযথা কেটে এনে কোনো লাভ নেই।’
‘এ বছর আবাদের লক্ষ্যমাত্র প্রায় অর্জিত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি না আসতো, তবে উৎপাদনও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতো’—কৃষি কর্মকর্তা
তিনি বলেন, ‘আমি ছয় কেদার জমিতে আবাদ করেছিলাম। এখন দুই কেদার জমির ধানও কাটতে পারবো কি-না জানা নেই। অন্তত বছরের খোরাকিটা তুলতে পারি কি-না চেষ্টা করে দেখি।’
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবছর আবাদের লক্ষ্যমাত্র প্রায় অর্জিত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যদি না আসতো তবে উৎপাদনও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতো।’
খলায় শুকানো হচ্ছে ধান। ছবি-জাগো নিউজ
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দু-একদিনের মধ্যেই তালিকা তৈরি শেষ হয়ে যাবে। এরপর তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। সেখান থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমি। আবাদ করা হয় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০৪ হেক্টর জমি কম আবাদ করা হয়। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন।
আবাদকৃত জমির মধ্যে এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৪৮ হাজার ৬৬৪ হেক্টর জমির ধান। এখনো কাটতে বাকি ৭৪ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমির ধান। পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১ হাজার ৬৫২ হেক্টর জমির ধান।
ইআরকে/এসআর/জেআইএম