অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রী পরিবহন, ইচ্ছেমতো নেয়া হচ্ছে ভাড়া
রাস্তায় কড়াকড়ি আর সারাদেশে যানবাহন বন্ধ থাকার পরও বগুড়া থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় ফিরেছে মানুষ। জেলার শহরতলীতে মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা এখন রমরমা। যাত্রী প্রতি নেয়া হচ্ছে হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা।
অনেক সময় আবার পুলিশি ঝামেলা এড়াতে একজনকে রোগী বানিয়ে বাকিদের আত্মীয় স্বজন পরিচয় দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জোগাড় করে দেয়া হচ্ছে রোগীর বানানোর ভুয়া সার্টিফিকেটও।
মঙ্গলবার (১৮ মে) সকালে বগুড়া বনানী মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রী তোলার অপেক্ষায় সারিসারি অ্যাম্বুলেন্স। প্রথমে দেখে যে কেউ এ স্থানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়েছে ধারণা করতে পারেন। তবে এরা রোগী নয় বরং ঢাকামুখী যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
শফিকুল নামের একজন যাত্রী ঢাকায় যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স চালকের সঙ্গে দরদাম করছেন। চালক মিরাজের এক কথা, জন প্রতি ১২০০ টাকা দিতে হবে। আর কোনো লাগেজ থাকা যাবে না।
এর পেছনে সাইরেন বাজিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে থামল। সেখানে ওঠার জন্য দৌড়ে গেলেন মিনারা বেগম এবং তার স্বামী মনির হোসেন। তারা দুজনই ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। সঙ্গে বড় ব্যাগ থাকায় অ্যাম্বুলেন্সের চালক তাদের নিতে রাজি হলেন না। বেশি টাকা দিতে চাওয়ার পরও চালক আব্দুল গফুর বলে দিলো ব্যাগ নিলে ট্রাকে যান। ফলে এই দম্পতি দৌড়ালেন পাশের দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের দিতে। সেখানেও জন প্রতি এক হাজার টাকা আর ব্যাগের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হলো তাদের।
পরিচয় গোপন করে যোগাযোগ করা হয় বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স মালিকের সঙ্গে। তার গাড়ি শহরের মধ্যে বেশি চলে। ঢাকায় রিজার্ভে যাওয়ার কথা শুনে অনেক প্রশ্নের পর রাজি হলেন। কিন্তু ভাড়া দাবি করলেন ১৪ হাজার টাকা। একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন তার গাড়িটি নন এসি। আর পথের সব খরচ ভাড়াকারীকে দিতে হবে। পুলিশি ঝামেলা হলে বলতে হবে এটা রোগীর গাড়ি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বগুড়া শহরে বৈধ অবৈধ মিলিয়ে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে তিন শতাধিক। এসব অ্যাম্বুলেন্সের ৯০ ভাগই এখন যাত্রী বহন করছে। জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীকে বহনের জন্য শহরে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছে না।

কথা হয় অ্যাম্বুলেন্স চালক আমির হামজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় কড়াকড়ি থাকায় অনেক সময় পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়। এছাড়া যাত্রী টানার ব্যবসা মোটামুটি ভালো। তবে রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণে যেতে এবং ফিরে আসতে সময় লাগে বেশি। এটা উসুল করতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। তবে সবগুলো অ্যাম্বুলেন্স এলপিজি গ্যাসে চলার কারণে লাভ অনেক বেশি। এজন্য মালিকরাও যাত্রী পরিবহনে আগ্রহী বেশি।’
আমিনুল নামের আরও একজন চালক বলেন, ‘আপনি যদি পুরো অ্যাম্বুলেন্সই নিয়ে যেতে চান তাহলে একজনকে রোগী সাজাতে হবে। কোনো একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে একজনের পায়ে বা মাথায় ব্যান্ডেজ করে সঙ্গে চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে নেব। তাহলে পথে কোনো সমস্যা নাই।’
বগুড়া প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতা আসাদুল্লাহ প্রামানিক বলেন, ‘আমরা এমন যাত্রী বহনের অভিযোগ প্রতিদিনই পাই। যাত্রী নেয়ার কোনো বিধান নেই এটাও মানি। কিন্তু করোনার কারণে ভাড়া কমে যাওয়ায় এখন কেউ সমিতির কথা শোনে না। কোনো গাড়ি ধরা পড়লে আমরা পুলিশের কাছে কোন তদবিরও করছি না। সবাইকে বলে দিয়েছি নিজের রিস্কে গাড়ি চালাতে হবে।’
বগুড়ার শেরপুরে হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর বানিউল আনাম। দায়িত্ব পালন করছেন বগুড়ায়। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল বেড়ে গেছে। আর আত্মীয় স্বজন পরিচয়ে যাত্রীও থাকে ঠাসা। রোগী একজন কিন্তু তার সঙ্গে গাড়িতে থাকেন ১০ জন। আমাদের সন্দেহ হলে থামাই। কখনো কখনো কাগজপত্রও চেক করি। রোগীর কাগজপত্র না থাকলে অ্যাম্বুলেন্স যেখান থেকে আসে সেদিকে ঘুরিয়ে দিই।’
তিনি স্বীকার করেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে অনেক যাত্রীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলছে।
এ বিষয়ে বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘অনেকেই রোগী সেজে পরিবার পরিজন বা আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। এজন্য শহরের বাইপাস মোড়গুলোতে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
এসেজে