দুধের নহর বয়ে যায়

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০৫:১৫ পিএম, ০১ জুন ২০২১

পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর উপজেলা কিম্বা পাশের শাহজাদপুরের নদী বেষ্টিত গ্রামগুলো থেকে সকাল-বিকাল যখন নৌকা বা স্পিডবোটযোগে দুধের ড্রাম বাঘাবাড়ির দিকে যায় তখন আক্ষরিক অর্থেই বলা যায় দুধের নহর বয়ে যায়...। একটি সফল শ্বেত বিপ্লব হয়েছে এ এলাকায়।

বৃহত্তর পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলা থেকে শুরু করে শাহজাদপুর অবধি নাগডেমড়া, পাথাইল হাট, সেলন্দা, হাড়িয়া, বিল চান্দো, কেনাই, রতনপুর, শাকপালা, চর ততুলিয়া, বহলবাড়ী প্রভৃতি এলাকার বিল অঞ্চলে দূর-অতীত থেকেই অবারিত জলরাশি আর ভূ-খণ্ড ছিল। গোয়াল ভরা গরু আর বিল ভরা মাছ সবসময়ই ছিল এ এলাকায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এখানে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র বিশেষ করে মিল্ক ভিটা স্থাপনের পর থেকে দুগ্ধ শিল্প প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। দুগ্ধ শিল্পের আশাতীত বিকাশ দেখে অনেকেই রসিকতা করে বলেন পাবনার বেড়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া আর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা এখন দুধের দেশ ‘নিউজিল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে।

jagonews24

নিউজিল্যান্ডখ্যাত বৃহত্তর পাবনার সাঁথিয়া, বেড়া, শাহজাদপুর, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বসতবাড়ির অঙিনায় ও বাথানে গবাদিপশু পালন করা হয়। লক্ষাধিক উন্নতজাতের গাভি পালনের আয়ে এলাকাবাসির আর্থিক অবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। উন্নতজাতের গাভি পালন করে এলাকার হাজারও কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

যাদের এক সময় কৃষি কাজ করে দুই বেলা ভাতই জুটত না। তারাই এখন এক থেকে দুই মণ দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন দুই থেকে চার হাজার টাকা আয় করছেন।

সাঁথিয়ার রতনপুর গ্রামের খামারী ফজলু খান জানান, দুই বছর আগে ৪০ হাজার টাকায় ‘ফ্রিজিয়ান-১০০’ জাতের একটি গাভি কিনেন। যার বর্তমান মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা। গাভিটি এক বছর আগে একটি উন্নতজাতের বাছুর দিয়েছে। যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ওই গাভিটি সম্প্রতি আরও একটি বাছুর দিয়েছে। মাত্র দুই বছরে গাভিসহ দুই বাছুরের বর্তমান দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ওই গাভিটি প্রতিদিন ২২ লিটার করে দুধ দেয়। গাভির খাওয়া খরচ হিসাবে ৩০০ টাকা বাদ দিলে প্রতিদিন ৭১২ টাকা আয় থাকছে। এ হিসেবে প্রতি মাসে তার লাভ হয় ২১ হাজার ৩৬০ টাকা।

jagonews24

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খাঁন তরুণ জানান, পাবনায় প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হয়। দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা পাবনার ভাঙ্গুড়া ক্রয় কেন্দ্র, সিরাজগঞ্জের লাহিড়ী মোহনপুর ও বাঘাবাড়ি মিল্কভিটায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করে। এ অঞ্চলে প্রায় এক হাজার দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমিতির মাধ্যমে দুধ সরবরাহ করে থাকেন। সমিতিভুক্ত মোট সদস্যের সংখ্যা ৫০ হাজার। এছাড়া সমিতির বাইরেও কয়েক হাজার খামারি দুধ সরবরাহ করেন বলে জানান তিনি।

এছাড়া ৭৫-৮০ হাজার লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ঘোষরা ২৮-২৯ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করেন। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুধ প্রক্রিয়াজাত করে রাজধানীতে পাঠাতে বেশ কয়েকটি চিলিং সেন্টার স্থাপন করেছেন। অধিকাংশ স্থানে খামারিরা বাড়িতে বসেই দুধ বিক্রি করতে পারেন। ঘোষরা বাড়ি- বাড়ি গিয়ে দুধ কিনে চিলিং সেন্টারে সরবরাহ করেন।

এদিকে গো- খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার পরিচলনা করতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন এলাকারর ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। তারা জানান, গো- খাদ্যের দাম বিশেষ করে দানাদার গো- খাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

jagonews24

গো-খাদ্য বিক্রেতারা জানান, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গো-খাদ্য আনেন। পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে গো-খাদ্যের ওপর।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন জানান, প্রায় আট হাজার হেক্টর জমিতে ঘাস চাষ হয়। তাই কাঁচা ঘাসের অভাব নেই। খাদ্য সঙ্কট রয়েছে এমনটি নয়। দানাদার খাদ্যের দাম বেড়েছে।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এএইচ/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।