তাঁবুতেই ১৫ বছর
স্বামী হারিয়েছেন ১৫ বছর আগেই। ভিটে-মাটি টুকুও কেড়ে নিয়েছে মেঘনার ভয়াল থাবা। সবকিছু হারিয়ে একমাত্র মেয়েটিকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে নেমেছিলেন আছিয়া বেগম (৪৯)। নদীর পাড়ে ছোট্ট একটি তাঁবুর ব্যবস্থা করে থাকেন। দেখতে দেখতে সেখানে ১৫টি বছর পার করে দিলেন। এত বছরেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি তার।
চাঁদপুরের হাইমচরে উপজেলার ৩নং আলগী দূর্গাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্বচর কৃষ্ণপুর গ্রামের নদীর তীরে বসবাস করেন আছিয়া বেগম। তার স্বামী গনি মাঝি স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য স্থানীয় হয়েও দীর্ঘ ১৫ বছর একটি তাঁবুতে কাটাতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
এলাকায় পরিচিত হাজারো মানুষ থাকলেও কেউই অসহায় এই মানুষটির পাশে এসে দাঁড়ায়নি। আসেনি কোনো মেম্বার, চেয়ারম্যান বা স্থানীয় কোনো নেতাকর্মী। আশপাশের মানুষের বাড়িতে গিয়ে কোনো রকম দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন।

বর্তমানে অসহায় বৃদ্ধা আছিয়া বেগমকে আল্লাহ ছাড়া সাহায্য করার মতো কেউ নেই। কারণ দুনিয়াতে তার আপন বলতে একমাত্র মেয়ে ছাড়া আর কেউই নেই। মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ৫ বছর আগে তারও ডিভোর্স হয়ে যায়। সে এখন ঢাকায় একটি গার্মেন্টে চাকরি করে।
মেয়ের সঙ্গেও যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন আছিয়া বেগমের। বড় নাতনির বয়স ১০ বছর। সে তার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় থাকে। ছোট নাতনি শান্তাকে (৭) নিয়েই এই তাঁবুতে পড়ে থাকেন তিনি। ঝড়-বৃষ্টি বজ্রপাত যে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার আশ্রয়স্থল এটি। যদিও মাঝে মাঝে পার্শ্ববর্তী কারো বাসায় গিয়ে অবস্থান করেন। কিন্তু গভীর রাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় না। মৃত্যুর ভয় নিয়েই সেখানে রাত কাটান তিনি।
নিজেদের বসতভিটা নদীতে তলিয়ে গেছে। নিজের কোনো জায়গা-জমি না থাকায় নদীর পাড়ে লতাপাতা ও সামান্য ভাঙা কিছু টিনের টুকরো দিয়ে তাঁবু তৈরি করে সেখানেই বছরের পর বছর বসবাস করে আসছেন। ভাঙ্গাড়ির জিনিস খুঁজে বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে কোনো রকমে চলছে। কেউ দিলে খেতে পায়, কিছু না পেলে না খেয়েই থাকতে হচ্ছে তাকে।

অসহায় আছিয়া বেগমের ভাগ্যে আজও জোটেনি সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা। যদিও ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে অনেকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন। তাই এখন আর যান না কারো কাছে। নিজের ভাগ্য মেনে নিয়ে চুপচাপ দিন কাটাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বসবাসের তাঁবুটি খোলা জায়গা হওয়ার কারণে এখানে প্রচণ্ড মশা মাছি আর পোকা-মাকড়ের আতঙ্কতো রয়েছেই। সাথে সাথে বিষাক্ত সাপের ও ভয় থাকে সবসময়। চোখের জল আর কারো সাহায্যের অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে সীমাহীন কষ্ট বুকে নিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
তিনি জানান, শুধু ভোটের সময় আসলেই নেতাকর্মীরা আমাগো খবর নেই। কোথায় আছি খুঁজে বের করে ভোট দেয়ার জন্য নিয়ে যায়। তারপর আর কেউ খোঁজ রাখে না। এমন অসহায়ের মতো দিন কাটাই কই কেউ তো একবার আসলো না। কোনো মেম্বার চেয়ারম্যান বলতে পারবে না আমাকে ৫ কেজি চাল দিয়ে সাহায্য করেছে। আগে অনেকবার গেছি এখন আর যাই না। বেশি গেলে বলবে গরিব বলে বেহায়া হইয়া বারবার তাদের কাছে যাই।

এ ব্যাপারে অসহায় আছিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি অসহায় এই পৃথিবীতে আমাকে দেখার মতো কেউ নেই। কিন্তু এরপর আর এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং সরকারের কেউ কখনো আমার কাছে আসেনি। তারপর মাঝে মাঝে কেউ কেউ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে আমাকে কিছুটা সাহায্য ও সহযোগিতা করার কারণে এখনো বেঁচে আছি। আমি সরকারের দেয়া কোনো কিছুই পাই না। সরকারের কাছে আকুল আবেদন করছি তারা যেন আমাকে আগে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।
স্থানীয়রা জানান, আছিয়া বেগম স্থানীয় বাসিন্দা। নদী বসতভিটা সব নিয়ে গেছে। সব সময় আসা যাওয়ার সময় দেখি তিনি কখনো রাস্তার বিভিন্ন পট ও বোতল খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করে সেগুলো বিক্রি করেন। এভাবেই কোনো রকম চলছেন তিনি।
জনপ্রিয় সোশ্যাল ওয়ার্কার স্থানীয় ফিরোজ হাসান বলেন, ভিটেহীন নানি-নাতনির এই অসহায়ত্ব দেখে খুবই কষ্ট হয়। আসা-যাওয়ার পথে যখন দেখলাম আমার পক্ষ থেকে সামান্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি। আমি চাই তাদের স্থায়ী একটা ব্যবস্থা হোক।

বিষয়টি জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশকে অবহিত করলে তিনি বলেন, ঘটনাটি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ‘দেশে একটি মানুষও ভূমিহীন গৃহহীন থাকবে না’ বাস্তবায়নে চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুতই আছিয়া বেগমকে সার্বিক সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করা হবে।
নজরুল ইসলাম আতিক/এমআরএম/জিকেএস