কোন্দলে ধুঁকছে কক্সবাজার জেলা আ.লীগ

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৫:৩৭ পিএম, ১২ জুন ২০২১

একটি সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। দল পরিচালনা ও পুনর্গঠনে পুরো জেলায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন দায়িত্বশীল নেতারা।

দলের ভেতর বিভাজনের রাজনীতিও করছেন অনেকে। এসব কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে দলীয় কর্মকাণ্ড। ফলে জেলা আওয়ামী লীগে লেজেগোবরে অবস্থা বিরাজ করছে।

দলের ত্যাগী নেতাদের মতে, বর্তমান কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে একটি নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত।

সম্প্রতি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সংসদ সদস্য জাফর আলম ও পৌর সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটুকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সংগঠনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগে সিন্ডিকেটের ধান্ধাবাজি ছাড়া কোনোরকমের রাজনীতির চর্চা নেই। তার পক্ষে চাটুকারিতা এবং অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করা-ই এখন রাজনীতি।

এরই মধ্যে সাধারণ সম্পাদকের নানারকম সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়ায় জেলা কমিটির অন্যতম সদস্য রাশেদুল ইসলাম, চকরিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম, পৌর সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটুকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যদি দলের বৈঠকে এসব বহিষ্কার সিদ্ধান্ত প্রচার হয়েছে।

এছাড়া প্রচার সম্পাদক মো. খোরশেদ আলম, সহ-দফতর সম্পাদক আবু তাহের আজাদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক মুকুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী রনজিত দাশ, আইন বিষয়ক সম্পাদক আইনজীবী আব্বাস উদ্দিন আহমদসহ অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে গালিগালাজ, অপদস্থ ও নিগৃহীত করেছেন মুজিবুর রহমান। তিনি দলীয় সভায় প্রকাশ্যে নেতাকর্মীদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। যা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। এতে সাধারণ জনগণের মাঝে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, মুজিবুর রহমানের সব অপকর্মের বিষয়ে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বাঁকখালী নদী দখল, জমি দখল, হোটেল দখল, ব্যাপক চাঁদাবাজি, দখলদারী, মার্কেট দখলসহ নানা রকম অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। সবগুলো তদন্ত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জ জেলার মতো কক্সবাজার জেলায়ও আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক দুজনকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন দুজনকে দায়িত্ব দেয়ার জন্য দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা ছিল। কিন্তু মুজিবুর রহমান কেন্দ্রের কয়েকজন নেতাকে 'বিশেষভাবে ম্যানেজ’ করে এ যাত্রায় তার সাধারণ সম্পাদক পদটি কোনোরকমে রক্ষা করেছেন। এ বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ বলেও জানা গেছে।

শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের অগঠনতান্ত্রিক ও শিষ্টাচার বর্জিত আচরণের কারণে জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জেলার দলীয় পাঁচজন সংসদ সদস্যের মধ্যে চারজনের সঙ্গে কোনোরকম সুসম্পর্ক নেই। সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সঙ্গেও নেই কোনোরকম সমন্বয়।

সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত জেলা শ্রমিক লীগের কমিটি বাতিল করে আপন ভায়েরা ভাইকে শ্রমিকলীগের সভাপতি করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তদবির করেন মুজিবুর রহমান। এ কারণে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন।

অতি সম্প্রতি উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠনে বিশাল অংকের টাকা উৎকোচ নিয়ে নিজের পছন্দের লোকদের নিয়ে কমিটি গঠনের জন্য জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নানাভাবে চাপ দেন মুজিবুর রহমান। পরে বিষয়টি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অবগত হলে তারা মুজিবুর রহমানকে ছাত্রলীগের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার জন্য সতর্ক করে দেন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টি কক্সবাজারের সব মহলে ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়।

মুজিবুর রহমানের একক চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের কারণে জেলার আটটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী জিতেছেন মাত্র তিনটিতে। অপর পাঁচটিতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি, ত্যাগী ও দক্ষ সংগঠক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম চৌধুরী মারা যান। কিন্তু তার স্মরণে একটি সভা বা দোয়া মাহফিলও করেনি জেলা আওয়ামী লীগ।

জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পর থেকে গত সাড়ে চার বছরে গঠনতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে একটি বর্ধিত সভা কিংবা কার্যকরী কমিটির নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। হুট করে সাধারণ সম্পাদক মোবাইল ফোনে কথিত জরুরি সভা ডাকেন নিজের মর্জিমাফিক। ওই সভা তিনি একাই বক্তব্য দিয়ে শেষ করে দেন।

দলের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমানে দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত। তারা দলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চর্চার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। তাদের সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করারও কোনো উদ্যোগ নেই। দলে এখন হাইব্রিড এবং স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের জয় জয়কার।

জেলার আওতাধীন ১১টি সাংগঠনিক উপজেলার সাংগঠনিক অবস্থা ও খুবই নাজুক এবং নড়বড়ে। উপজেলা সংগঠনের সঙ্গে ও জেলা কমিটির কোনো সম্পর্ক ও সমন্বয় নেই বলেও জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে টেকনাফ উপজেলায় সাধারণ সম্পাদক আছেন তবে সভাপতি পদ শূন্য। কক্সবাজার সদর উপজেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। রামু উপজেলা কমিটির সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ সদস্যের বিরোধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরম পর্যায়ে। চকরিয়া উপজেলায় পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন এখন চরম পর্যায়ে। চকরিয়া পৌরসভায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে।

পেকুয়া উপজেলায় সভাপতি পদশূন্য দীর্ঘদিন। কুতুবদিয়া উপজেলায় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বিরোধ লেগে আছেই। মহেশখালীতে সভাপতি বয়োবৃদ্ধ। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। সাধারণ সম্পাদক স্থানীয় সংসদ সদস্য। তিনি জেলা আওয়ামী লীগেরও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

সভাপতি সিরাজুল মোস্তফাকে সরিয়ে যখন কেন্দ্রের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক করা হয় তখন জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি সাবেক সংসদ এথিন রাখাইনকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়নি। এ সময় নেতাকর্মীদের অনেকের ধারণা ছিল তিনজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থেকে অভিজ্ঞ একজনকে সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব দেয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষ পদে সফলভাবে নেতৃত্ব দেয়া, দক্ষ সংগঠক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রনজিত দাশকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে এমন প্রচারণা ছিল। শেষপর্যন্ত তা হয়নি। মুজিবুর রহমানই তদবির করে সপদে থেকে যান।

এদিকে, চকরিয়ার দুজন সভাপতিকে অব্যাহতির ঘোষণার পর রোববার (১৩ জুন) দু’পক্ষকে কেন্দ্রে ডাকা হয়েছে বলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান ও চকরিয়া উপজেলা সভাপতি জাফর আলম শুক্রবার পৃথক সভায় প্রচার করেছেন। সেখান থেকে কী সিদ্ধান্ত আসছে তার দিকেই নজর জেলার আওয়ামী পরিবার ও রাজনীতি সচেতনদের।

জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সর্বত্র নোংরামি চলছে। এখানে একটি বড়সড়ো ঝাঁকুনি দরকার। ব্যাপক পরিবর্তন দরকার জেলা উপজেলার সর্বত্র। কেন্দ্র বুঝতে যতই দেরি করবে ততোই দুর্গন্ধ ছড়াবে। তাই এখনই লাগাম টানা দরকার।’

চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য জাফর আলম বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের জন্য লড়ার পর থেকেই মুজিবুর রহমানসহ তার অনুসারীদের রোষানলে পড়ি। তাই সাংগঠনিক নিয়ম তোয়াক্কা না করে, মনগড়া ভাবে রাজনৈতিক মাঠ ঘোলাটে করতেই অব্যাহতির নাটক প্রচার করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের অপরাজনীতিতে জেলা যুবলীগকেও শরীক করা হয়েছে। যা কখনো শোভনীয় নয়।’

নিজের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘যা কিছু করা হয়েছে সব দলের শৃঙ্খলার জন্যই। যখন যা করেছি কেন্দ্রকে অবহিত করেছি। রোববার ঢাকায় ডেকেছে, সেখান থেকে যে নির্দেশনা পাব সেভাবেই সামনে এগোবো।’

দলের সার্বিক বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলে তারও উত্তর না করায় বক্তব্য জানা যায়নি।

সায়ীদ আলমগীর/এসজে/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]