শিশু তৃষা ধর্ষণ ও হত্যা : আসামিদের খালাসে আইনজীবীদের ক্ষোভ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ১৯ জুন ২০২১

 

যশোরের চাঞ্চল্যকর শিশু তৃষা আফরিন কথা (৮) ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বাদী, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রায়ে দুই আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক টিএম মুসা এ রায় দেন।
সম্প্রতি মামলাটির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের বর্ণনা ও পর্যবেক্ষণে ‘অসঙ্গতি’ আছে অভিযোগ এনে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানান তারা।

ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু তৃষা শহরের খোলাডাঙ্গা এলাকার স্যালভেশন আর্মিপাড়ার বাসিন্দা তরিকুল ইসলামের মেয়ে ও কারবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২য় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- শহরের খোলাডাঙ্গা গাজীপাড়ার মেহেদী হাসান শক্তি এবং সাইফুল ইসলাম। এই মামলার প্রধান সন্দেহভাজন শামীম পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৩ মার্চ বিকেলে বাড়ির পাশে গির্জার মাঠে খেলতে যায় তৃষা। সন্ধ্যার পরও বাড়ি না ফেরায় স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি করে তাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। পরদিন তৃষার বাবা এ ঘটনায় যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এদিন বিকেলে এলাকার একটি বাড়ির পাশে মাটি খোড়া দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। এরপর সেখানকার মাটি সারিয়ে বস্তাবন্দী অবস্থায় তৃষার লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, তৃষা হত্যা ও ধর্ষণে জড়িত সন্দেহে সাইফুল ইসলামকে আটক করেন যশোর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক শিহাবুর রহমান। সে একই এলাকার আব্দুল আওয়ালের ছেলে। ওই সময় সাইফুল শিশু তৃষা হত্যা ও ধর্ষণে সংশ্লিষ্টতার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করে। এরপর এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন শামীমকে পুলিশ আটক করতে গেলে দুইপক্ষের মধ্যে ‘গোলাগুলিতে’ শামীম নিহত হন। মাদক সেবনে বাধা ও জোরপূর্বক ইজিবাইকে ওঠা নিয়ে তৃষার বাবার সঙ্গে শামীম ও শক্তির বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তৃষাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

তদন্ত শেষে আসামিদের দেয়া তথ্য ও সাক্ষীদের বক্তব্যে হত্যা এবং ধর্ষণে জড়িত থাকায় মেহেদী হাসান শক্তি এবং সাইফুলসহ দুজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন পুলিশ পরিদর্শক শিহাবুর রহমান শিহাব। চার্জশিট দেয়ার সময় অভিযুক্ত মেহেদী হাসান শক্তি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির জন্য আদালতকে অনুরোধ করা হয়।

এছাড়া, ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ী শামীম গত বছরের ৬ মার্চ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ায় চার্জশিটে তার অব্যাহতির আবেদন করা হয়। চার্জশিট দেয়ার পর অভিযুক্ত শক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন।

দীর্ঘদিন পর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গত ১১ জানুয়ারি যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক টিএম মুসা এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মেহেদী হাসান শক্তি এবং সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘অভিযোগের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায়’ বিচারক তাদের খালাস দেন।

এই রায়ে তৃষার বাবা, মা, আইনজীবী এবং যশোরের বিভিন্নস্তরের মানুষ বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট হয়েছে।

সম্প্রতি এই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। ১৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের বর্ণনায় রায় এবং পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের মতে, ভুক্তভোগী তৃষাকে ডেকে নিয়ে আসামি শামীমের ঘরে ধর্ষণ ও হত্যা এবং শামীমের বাড়ির পেছনে পুঁতে রাখা হয়। ফলে এই মামলার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। কিন্তু আসামি সাইফুল ইসলামের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার ঘর থেকে নিহতের পরিধেয় জামা ও প্যান্টের ছেঁড়া অংশ এবং পুঁতে রাখা লাশ উদ্ধারসহ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যে মামলাটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরেও আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা আসামি সাইফুলের রিমান্ড শেষে প্রদত্ত প্রতিবেদনে দুটি মেডিকেল টিকিট দিয়েছেন। টিকিটে ট্রমাটিক পেইন ও ফিভার (জ্বর) লেখা আছে। ফলে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে মারপিট করে দোষ স্বীকার (১৬৪ ধারায়) করানো হয়েছে।

কিন্তু আইনজীবীরা বলছেন, এই পর্যবেক্ষণ যথার্থ নয়। কারণ ট্রমাটিক পেইন অর্থ শারীরিক আঘাত নয়, এটি মানসিক আঘাতকে বোঝায়। একটি শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার কারণে আসামি সাইফুল ট্রমাটিক পেইনে ভুগছিলেন, এমন পর্যবেক্ষণ আসাই প্রাসঙ্গিক ও আইনানুগ ছিল। আর ফিভার বা জ্বর; সেটা যে শারীরিক আঘাতের কারণেই হয়েছে, এমন পর্যবেক্ষণও মোটেই আইনানুগ নয়।

আসামি সাইফুল ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, ধর্ষণের পর চলে যাওয়ার সময় মেয়েটি অজ্ঞান অবস্থায় পড়েছিল। অথচ রায়ের ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি মতে ‘এই আসামি শামীমের ঘরে ঢোকার আগেই ভিকটিমের হাত-পা বাঁধা ও মুখে কাপড় গুঁজে ধর্ষণসহ হত্যা করা হয়েছিল দেখা যায়।’

পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী, সাইফুলের তথ্যানুযায়ী তার ঘর থেকে ভুক্তভোগীর পরিধেয় জামা ও প্যান্টের ছেঁড়া অংশ উদ্ধার করা হয়। সাক্ষ্য আইনের ২৭ ধারা মতে, এই আলামত উদ্ধার আসামির বিরুদ্ধে শতভাগ প্রমাণ বহন করে। অন্য একটি জব্দ তালিকায় বলা হয়েছে, সালোয়ারের অংশবিশেষ দিয়ে ভুক্তভোগীর মুখ বাঁধা ছিল।
আলামত সম্পর্কে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, একই আলামত অর্থাৎ ভিকটিমের পরনের কাপড় দুই জায়গা থেকে জব্দ দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো, ভিকটিমের পরনের কাপড়ের ছেঁড়া অংশ সাইফুলের ঘর থেকে এবং অন্য অংশ লাশের সঙ্গে ছিল। ফলে ওই পর্যবেক্ষণও আইনসিদ্ধ নয়।

বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এবং সত্য বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিচারিক হাকিম। অথচ রায়ে স্বীকারোক্তি সত্য নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ আইনসিদ্ধ নয়। বরং, ‘প্রমাণিত হয়নি’ বলা হলেও বিষয়টি যুক্তিযুক্ত হতো।

এ বিষয়ে যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর তৃষা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে, যেগুলো আইনসিদ্ধ নয়। আসামি সাইফুলের স্বীকারোক্তি এবং সে অনুযায়ী আলামত ও লাশ উদ্ধারসহ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য মামলাটিকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। কিন্তু তারপরেও রায়ে আসামিদের খালাস দেয়া হয়েছে।’

মহিলা পরিষদ যশোরের লিগ্যাল এইড সেল প্রধান অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার কনা বলেন, ‘শিশু তৃষা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর। আলোচিত এ ঘটনার বিচার দাবিতে যশোরের মানুষ রাস্তায় নেমেছে, মানববন্ধন-সমাবেশ করেছে, সুষ্ঠু বিচার চেয়েছে। অনেক মামলার ক্ষেত্রে চাক্ষুষ সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য কখনও মিথ্যা বলে না। তাই পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যকে এড়িয়ে কীভাবে আসামিরা খালাস পেল তা বোধগম্য নয়। এটি একটি অস্বাভাবিক রায়।’

এতে আমারা বিস্মিত ও অবাক হয়েছি। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মিলন রহমান/এসএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]