তিন মাসেই আতাইকুলার দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছেন ওসি জালাল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ১০:১৩ পিএম, ২৫ জুলাই ২০২১

পাবনার আতাইকুলা থানায় নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন যোগ দেয়া তিনমাসও হয়নি। কিন্তু জনপ্রত্যাশা পূরণ হয়েছে প্রায় শতভাগ। সন্ত্রাস, মাদক আর গরু চোরদের আখড়া বলে পরিচিত থানার বদনাম ঘুচতে শুরু করেছে। কর্মদক্ষ ওসি এরই মধ্যে তার কাজ দিয়ে পুলিশের মাসিক অপরাধ সভায় বিশেষ পুরস্কার লাভ করেছেন।

গত ১৩ জুন পাবনা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জেলা পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সিসিটিভি স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় তাকে বিশেষ পুরস্কার দেন পাবনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান।

পাবনা জেলার সাঁথিয়া, আটঘরিয়া এবং পাবনা সদর উপজেলার কিছু ইউনিয়ন মিলে ২০০১ সালে গঠিত হয় আতাইকুলা থানা। এটি গঠনের পর থেকেই থানাটি ক্রাইম জোন হিসেবে চিহ্নিত হয়। এ থানা এলাকা একটা সময় সন্ত্রাসী এবং চরমপন্থী অধ্যুষিত এলাকা ছিল। দীর্ঘদিন চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ছিল আতাইকুলা থানা।

এক সময় সন্ত্রাস কমে গেলেও মাদকে ভরে যায় গোটা আতাইকুলা থানা এলাকা। গ্রামে- গ্রামে মুড়ি মুড়কির মতো মাদক কেনাবেচা হয়। পাড়ায়-পাড়ায় চলে জুয়ার আড্ডা। অনেকেই অভিযোগ করতেন কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে মাদক কারবারিদের সখ্যতা থাকায় অবস্থা লাগামহীন ছিল।

jagonews24

এ থানায় বেড়ে যায় গরু চুরির মতো ভয়াবহ ঘটনা। অনেক গ্রামের মানুষ গোয়াল ঘরে রাত যাপন করতে থাকেন। তারা এর আগে গরু চোরকে হাতেনাতে ধরে ফেললেও কিছু পুলিশ সদস্য এসে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেত। তারা প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেননি। থানার কয়েকটি পয়েন্টে মহাসড়কে চাঁদাবাজদের ব্যাপক দৌরাত্ম্য ছিল। তারা ডাকাতের মতো ঘিরে ধরত চালকদের। চাঁদা না দিলে মারধর করা হত।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পাবনার আতাইকুলা থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ জালাল উদ্দিন। তার যোগদানের পরই যেন রাতারাতি বদলে গেছে আতাইকুলা থানার দৃশ্যপট। থানার ভেতরে বাইরে পরিবর্তন লক্ষণীয়। মাদ্রক সম্রাট-সম্রাজ্ঞীরা এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। পাড়ায় পাড়ায় জুয়ার আসর উধাও। গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজারে সিসিটিভি লাগানোর ব্যবস্থাপনার কাজ করে দেয়ায় রাতে দোকানপাটে চুরি বন্ধ হয়েছে, অপরাধ কমেছে।

আতাইকুলার থানা ভবনের পাশে প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল বাতেনের বাসা। তিনি জানান, আতাইকুলা থানা প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে এত সুন্দর কর্মযজ্ঞ দেখিনি।

তার ছেলে ঠিকাদার মানিকুজ্জামানও জানালেন একই রকম কথা। বলেন, জনপ্রত্যাশা পূরণে এ ওসির ভূমিকা প্রশংসনীয়। এ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় চরপাড়া গ্রামের আকতার হোসেন, নায়েব আলীসহ বেশ ক’জন কৃষকের সঙ্গে।

jagonews24

তারা জানান, তাদের গ্রামের প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে গোয়াল ঘরে চৌকি পাতা রয়েছে। যেখানে সারা রাত শুয়ে শুয়ে চাষিরা গরু পাহারা দিতেন। এখন নতুন ওসি আসার পর থেকে একটি গরুও চুরি হয়নি। তাদের আর গোয়াল ঘরে থাকতে হয় না। পুলিশের প্রতি তাদের এখন অনেক আস্থা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন থানায় দালালদের দৌরাত্ম্য নেই। থানায় সেবা নিতে আসা মানুষের ভোগান্তি নেই। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন মসজিদে গিয়ে পর্যন্ত মানুষকে জানিয়েছেন পুলিশ জনতার বন্ধু। তারা তাদের যে কোনো আইনি সহায়তায় পুলিশের কাছে যেন নি:সংকোচে যান। যারাই এ ওসির কাছে গিয়েছেন তাদেরই ধারণা পাল্টে গেছে। পুলিশ জনতার বন্ধু তার প্রমাণ জনসাধারণ পেয়েছেন বলে সেবাপ্রাপ্তরা জানান।

এদিকে চাঁদাবাজ আর মাদক কারবারিদের ব্যবসায় জ্বলছে লালবাতি। চাঁদাবাজ মাস্তানদের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না ক্রাইম জোন আতাইকুলা এলাকায়। বিভিন্ন ‘বড় ভাই’দের নামে তোলা চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট নেই। আতাইকুলা, মাধপুর, বনগ্রাম, কুচিয়ামোড়া, পুস্পপাড়া, গংগারামপুরসহ বিভিন্ন বাজারে লাঠিয়াল বাহিনী নেই।

এলাকার স্থানীয় ভ্যান-রিকশা, অটোবাইক বা নছিমন চালকরাই তা জানিয়েছেন। আতাইকুলায় কৌশলে যানজট তৈরি করে সিরিয়াল পর্যন্ত বিক্রি করত কিছু চাঁদাবাজ। এখন যানজটমুক্ত আতাইকুলা বাজার এলাকা।

ওসি জালাল উদ্দিন জাগো নিউজকে জানান, তিনি আতাইকুলায় এসেই সমস্যার মূলে হাত দেন। এক্ষেত্রে ‘পাবনা পুলিশ সুপার’ মুহিবুল ইসলাম খানের নির্দেশনা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

jagonews24

তিনি জানান, তার থানা এলাকায় বনগ্রাম, আতাইকুলা, পুষ্পপাড়ার মতো দেশখ্যাত হাট রয়েছে। তিনি এসব হাটসহ অন্যান্য ছোট - বড় হাট বাজারকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তায় সিসিটিভির আওতায় আনতে পেরেছেন। এতে করে অপরাধমূলক কাজ দারুণভাবে কমে গেছে। এমনকি এবারের ঈদও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া কেটেছে। গরু চুরি বন্ধ করতে পেরেছেন। চাঁদাবাজি বন্ধ হয়েছে।

তিনি বলেন, গরিব ভ্যানওয়ালাদেরও চাঁদা দেয়া লাগত শুনে তিনি ব্যথিত ও ক্ষুদ্ধ হন। কঠোর হাতে তা দমন করতে পেরেছি। তবে সবই সম্ভব হচ্ছে এলাকার মানুষের সহায়তায়। তিনি তার দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করে যাচ্ছেন এবং যতদিন আতাইকুলায় আছেন তা করে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এমআরএম/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]