‘দূর বেডি, পোলাপানে ভাত দিলে কি আর রিকশা চালাই?’
তপ্ত রোদ। পশু-পাখিসহ মানুষজন যখন গরমে হাঁপিয়ে উঠছে ঠিক তখন হাড্ডিসার শরীরে রিকশার প্যাডেল চাপতে চাপতে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটছিলেন আব্দুস সালাম। তিনি নেত্রকোনা সদরের সিংহের বাংলা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাংলা গ্রামের বাসিন্দা। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে তার। সবাই বিবাহিত ও জীবিকার তাগিদে ঢাকায় বসবাস করেন।
শুক্রবার (৬ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রিকশায় চালের বস্তা নিয়ে মালিকের বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ আব্দুস সালাম। বিষয়টি নজরে পড়ে নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তারের। তিনি যাচ্ছিলেন সদরের সিংহের বাংলা ইউনিয়নের টিকাকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে। বৃদ্ধ রিকশাচালকের কষ্ট দেখে গাড়ি থেকে নেমে রিকশা থামান। জিজ্ঞেস করেন, ‘এত রোদে রিকশা চালাচ্ছেন কেন? ছেলেমেয়ে ভাত দেয় না?’
আব্দুস সালামের সরল উত্তর, ‘দূর বেডি, পোলাপানে ভাত দিলে কি আর রিকশা চালাই? ভাতের দায়িত্ব কেউ নেয় না। তাই এই বয়সেও প্যাডেলচালিত রিকশাই আমার অবলম্বন। নিজের ও স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য রিকশা চালাই।’
বৃদ্ধ এই ব্যক্তির এমন উত্তরে বাকরুদ্ধ হয়ে যান ইউএনও। পরে তিনি আব্দুস সালামের হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের খাদ্য সহায়তা।

খাদ্য সহায়তা পেয়ে খুশির শেষ ছিল না আব্দুস সালামের। তিনি বলেন, ‘পথ দিয়ে রিকশা নিয়ে যাচ্ছিলাম। গাড়ি থামতে দেখে প্রথমে ভয় পেলাম। লকডাউনে সড়কে দেখে আমাকে সাজা দেয়া হবে কিনা এই ভেবে ? পরে উনি (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) খাবার জিনিসপত্র দিয়ে গেলেন। আমি খুব খুশি হয়েছি। নিজের সন্তানরা খাবার দেয় না। রাস্তায় রিকশা চালাচ্ছি দেখে আমাকে এসব দিয়ে গেছে। এমন ভালা মানুষ জীবনেও দেখিনি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে করোনার টিকার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য যাচ্ছিলাম। পথে চাচার সঙ্গে দেখা। তিনি ২৫ কেজি ওজনের কয়েকটি চালের বস্তা একজনের বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন রিকশায় করে। প্রচণ্ড গরমে প্যাডেলচালিত রিকশায় চালের বস্তা টানতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। গাড়ি থেকে নেমে তাই জিজ্ঞেস করতেই চাচা বললেন, ছেলেমেয়েরা ভাত দেয় না। সবাই নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই মনে হলো একজন বাবা যিনি দায়িত্ব নিয়ে পাঁচ সন্তান বড় করে বিয়ে দিয়ে সংসারি করে দিলেন তারা পাঁচজন মিলেও কি সেই বাবার দায়িত্ব নিতে পারল না?’
তিনি আরও বলেন, ‘কথা বলার সময় বা আমি যে এত কিছু খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করছি উনি একবারও কোনো সাহায্য করার কথা বলেননি। উনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও কারো কাছে সাহায্য চেয়ে নত হননি দেখে খুব ভালো লাগল। তাই প্রধানমন্ত্রীর উপহার ত্রাণসামগ্রী যখন উনার হাতে তুলে দিলাম উনি এতটাই খুশি হয়েছেন যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
‘বয়স্ক ভাতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বছর খানেক ধরে তাও পাচ্ছেন না। বিষয়টি সমাধানের জন্য নাম-ঠিকানা নিয়ে এলাম যাতে সমস্যার সমাধান করা যায়।’
এইচ এম কামাল/এসআর/এএসএম