৪৩ বছরেও নিজের নৌকা হয়নি মনির মাঝির!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কালীগঞ্জ (গাজীপুর)
প্রকাশিত: ০৬:৩২ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

জীবনযুদ্ধের গল্পটা ঠিক ১২ বছর বয়সে রচনা করেছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ বাজার খেয়া ঘাটের মাঝি মো. মনিরুল ইসলাম (৫৫)। বর্তমানে খেয়াঘাটে ৩২টি নৌকা পারাপার করলেও মনিরই সবচেয়ে বয়স্ক। এজন্য তিনি তার জুনিয়র সহকর্মীদের কাছ থেকে সম্মানও পান বেশ। তিনি তার জুনিয়র সহকর্মীদের আদর-স্নেহ করেন।

আজও ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে লক্ষ্য মানুষের হৃদয়ে। বাবার সঙ্গে সেই কিশোর বয়সে নৌকার হাল ধরে বিরামহীনভাবে তিনি নদীতে নৌকা বেয়ে আজ বৃদ্ধের দলে। মাথার চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। কর্মঠ পেশি বহুল মেদহীন শরীরে এখনো লক্ষণ মাঝি সবলের মতোই কর্মক্ষম।

সদালাপী নিরহংকার সাদা মনের মানুষ শীতলক্ষ্যা নদীর কালীগঞ্জ বাজার সংলগ্নে খেয়াঘাটের প্রবীণ পারের কান্ডারি এই মনির মাঝি। তার জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছে মানুষ পারাপার করে। অদ্যাবধি তার জীবন তরী কূলে পৌঁছেনি। নদীর সঙ্গে আজন্ম পরিচয় তার। জীবনের পড়ন্ত বেলায় কূল পাবেন কিনা সে প্রশ্ন আজও থেকেই গেল। তবুও বৈঠা ছাড়ার চিন্তা তার মাথায় কখনও আসেনি।

সোনালী ফসল ফলে এমন জমি বা বসতভিটা কোনটিই নেই তার নামে। সেই কিশোর বয়স থেকে প্রায় বৃদ্ধ বয়সে এসেও বৈঠা হাতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সেই কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তার এ জীবন যুদ্ধ।

জীবনের শেষ সময়ে এ পেশায় থেকে নৌকার হাল ধরে পারাপার করছে শত শত মানুষকে। ঝড় বৃষ্টি বন্যা আর প্রখর রোদে কোনো কিছুই মনির মাঝির জীবনের জীবিকার পথে বাধা হতে পারেনি। উত্তাল শীতলক্ষ্যা নদীর বিপুল জলরাশিতে যে মানুষটি নৌকার হাল ধরেছেন, একজন দক্ষ মাঝি হিসেবে গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও নরসিংদীর পলাশ এই দুই উপজেলার শীতলক্ষ্যার মানুষ মনির মাঝি হিসেবেই চেনেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন মনির মাঝির চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ধক্য।

মনির মাঝি বলেন, তার নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে। শীতলক্ষ্যা নদীর মতো আমিও বেঁচে আছি মুমূর্ষ অবস্থায়। কিশোর বয়সে বাবা মৃত কালু মাঝির সঙ্গে বৈঠা হাতে সেই থেকে শুরু হয়ে চলছে অদ্যাবধি। জীবনের শেষ সময়েও এই নৌকা করে কতই না মানুষ পারাপার করছি কেউ কখনো আমার জীবনের গল্প লেখেনি শোনে নাই সুখ দুঃখের কথা।

তিনি বলেন, যার কেউ নেই তার সৃষ্টিকর্তা আছে। আগে ৫-৬শ টাকা কাজ হতো। আর নৌকা ভাড়া ও ঘাটে দিয়ে আমার ২ থেকে আড়াশ টাকা থাকতো। তা দিয়েই ২ ছেলে ২ মেয়েসহ ৬ জনের সংসার অনেক কষ্টে চলে। এখনতো করোনকাল সরকারের লকডাইনে মানুষ পারাপার খুব কম তাই কাজও কম। তবে মানুষ আমাকে ভালোবেসে অনেকেই সাহায্য করে। আর তা দিয়েই চাল-ডাল কিনে কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে কাটাতে হয় দিনের পর দিন।

মনির মাঝি জানান, তিনি ছোটকাল থেকেই দেখে আসছেন খেয়া পার হওয়ার জন্য ঘাটে কতজন কত কষ্ট করছে। সন্ধ্যার পর কষ্ট বেড়ে হয় দ্বিগুণ হয়। তাই অন্যের নৌকা ভাড়া নেন তিনি। আর সেই নৌকা তার মানবসেবার একমাত্র হাতিয়ার। আর এ কাজ করছেন দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে।

Monir-majhi2.jpg

খেয়াঘাটের মনির মাঝি এখন সবার মনের মাঝি। মনির মাঝির কাছে সেবার কোনো মূল্য হয় না, তাই কারো কাছে খেঁয়া পারাপারের জন্য তিনি কিছু চেয়ে নেন না তবে কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দেন তাহলে তা ফিরিয়েও দেন না। কিন্তু জীবনের এতটি বছর এ কাজে থেকেও নিজের একটা নিজস্ব নৌকা না থাকার কষ্ট তাকে খুব তাড়া করে।

মনির মাঝি বিশ্বাস করেন নি:শ্বাস ত্যাগ করলেও এ ঘাট থেকে তার নাম মুছবে না কোনোদিন। এটাই তার জীবনের আত্মতৃপ্তি। জীবনযুদ্ধে সর্বদা হাসি খুশি এ মানুষটি কখনও কারও সঙ্গে মুখ মলিন কথা বলেনি। যুগের পর যুগ কেটে গেল তবুও করতে পারেনি নিজস্ব একটি নৌকা। আর এটাই তার জীবনের বড় দুঃখ।

তিনি আরও বলেন, যতদিন শীতলক্ষ্যা নদী বেঁচে থাকবে, ততদিন বাবার স্মৃতি বিজড়িত বৈঠা হাতে বেঁচে থাকবে আমার জীবন-জীবিকার স্বপ্ন।

পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের মাতিচর গ্রামের মো. আলামিন (৩৫) বলেন, শীতলক্ষ্যা নদীর কালীগঞ্জ বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাটে নিয়োজিত মনির মাঝি খুবই সাদাসিধে কিন্তু তার স্বপ্ন প্রজাপতির ডানার মতো রঙিন। প্রতিদিন কর্মব্যস্ত মানুষ আমরা যারা নৌকায় নদী পারাপার হয়ে থাকি, তাদের হয়তো অনেকেই জানে না নৌকার মাঝির সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার খবর। তারপরও এই সাদাসিধে মনের মানুষটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পেশাদারিত্ব টিকিয়ে চলেছেন যুগের পর যুগ ধরে।

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার ভাদার্ত্তী গ্রামের মো. নামজুল হোসেন (৩২) জানান, তিনি মাঝে মধ্যে নৌকা করে কখনো পরিবার আবার কখনো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘুরেন। তবে ভালো আচরণ আর ব্যবহারের জন্য তিনি মনির মাঝিকেই বেছে নেন। তবে তিনি ঘাটে না থাকলে অন্য কাউকে নিয়ে যান।

কালীগঞ্জ বাজার খেয়াঘাটের ইজারাদার মোশারফ হোসেন জানান, আগে একটি প্রবাদ ছিল সারা রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি, গোদারাঘাটে এসে গড়াগড়ি, কারণ ঘাটে রাতের বেলায় কোনো মাঝি থাকতো না। কিন্তু আমাদের এই ঘাটে এই প্রবাদটা প্রচলিত নয় মনির মাঝির কল্যাণে। মানুষ পারাপারের কাজে কোনো প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হয়নি কখনও তার।

পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য আব্দুল আজিজ (লাল মিয়া) বলেন, মনির মাঝির ভালো ব্যবহারের সুখ্যাতি সবার মুখে মুখে। তিনি আসলেই একটা সাদা মনের মানুষ। মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি মনির মাঝি ছোটকাল থেকেই একজন পরোপকারী, কারো কষ্টের সময় নিজেকে তিনি আর ঠিক রাখতে পারেন না। দারিদ্র্যের কষাঘাত তাকে এ কাজে কখনও দমাতে পারেনি। তার কাছে মানুষের ভালোবাসাটাই সবচেয়ে বড়। এখানে টাকা পয়সার কোনো স্থান নেই।

আব্দুর রহমান আরমান/এমআরএম/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]