কৃষিকাজে ব্যবহারের নিবন্ধন নিয়ে ট্রাক্টর চলে মহাসড়কে

এমদাদুল হক মিলন এমদাদুল হক মিলন , দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৫:৫৬ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২১

ঘটনা ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর। বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ী থেকে মোটরসাইকেলযোগে একটি মামলায় দিনাজপুর আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছিলেন উপজেলার ৩ নম্বর শতগ্রাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম (৪৮), জাকিউল আফতাব বাবু (৪৫) ও সোলায়মান আলী (৪২)। পথে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মোড়ে ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে শফিকুল ইসলাম ও জাকিউল আফতাব বাবু মারা যান। প্রাণে বেঁচে যান সোলায়মান আলী।

দিনাজপুর শহর থেকে মোটরসাইকেলযোগে গ্রামের বাড়ি ফুলবাড়ীতে ফিরছিলেন হারুন অর রশিদ। আমবাড়ী এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে একটি ট্রাক্টর ধাক্কা দেয়। এতে ডান পা ও ডান হাত ভেঙে যায় হারুনের। গত বছর মার্চ মাসে এ দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।

হারুন অর রশিদ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের দিনাজপুর শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় সাত মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর এখন তিনি স্বাভাবিক। হারুন জানান, তিনি এখন স্বাভাব্কি জীবনযাপন করতে পারলেও ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় ২০০৩ সালে বড় ভাই এবং তারও কয়েক বছর আগে মামাকে হারিয়েছেন।

তবে শুধু হারুন নয়, তার মতো সড়ক দুর্ঘটনায় আত্মীয়-স্বজনদের হারিয়েছেন অনেকেই। আবার এসব দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব বরণ করে অতিকষ্টে জীবনযাপন করেছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়।

jagonews24

পাঁচ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় বাম পা হারিয়েছেন ফুলবাড়ী উপজেলার ইদুল মিয়া (৪৫)। তিনি পেশায় ছিলেন ট্রাক্টরচালক। বর্তমানে ১৩ বছর বয়সী ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে বাদাম বিক্রির আয়ে সংসার চলছে তার।

সম্প্রতি বালুবাহী ট্রাক্টরের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই পা ভেঙে যায় হামিদুল ইসলামের (৪৫)। শহরের নয়নপুর এলাকার বাসিন্দা হামিদুল স্ত্রীসহ দিনাজপুর ট্রাক টার্মিনালের পাশে ভাত বিক্রি করেন। ট্রাক্টরের মালিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন।

হামিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় উঠেছি মাত্র। ট্রলিটা সামনে থেকে আসছিল। ইশারাও করেছিলাম। একেবারে ওপর দিয়ে চালিয়ে দিলো। চিকিৎসার খরচ জোগাতে এখন ভিটেমাটি বন্ধক রাখার লোক খুঁজছেন হামিদুল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনাজপুরে গত কয়েক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। এসব দুর্ঘটনার পর প্রতিবাদে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ হয়। মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা অথবা ক্ষতিপূরণ মামলা হয়। তারপরও দুর্ঘটনা কমছে না।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের দিনাজপুর শাখার তথ্যমতে, জেলায় ২০১৮ সালে ৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৮৩ জনের, আহত হয়েছেন ১৬৪ জন। ২০১৯ সালে ১৩০টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১২৩ জনের, আহত ৫৬ এবং ২০২০ সালে (করোনা মহামারির কারণে এসময় বেশিরভাগ সময় পরিবহন চলাচল বন্ধ ছিল) ৭৭টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৯৯ জন, আহত হয়েছেন ৭৭ জন।

তবে জেলা থেকে প্রকাশিত স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩ জন। আহত হয়েছেন ৯৭ জন।

২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭৩টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩৮৮ জনের এবং আহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। এরমধ্যে বিরল, বীরগঞ্জ, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।

এসব দুর্ঘটনার এক তৃতীয়াংশই ঘটছে নিবন্ধন ও ফিটনেসবিহীন ভটভটি (ইঞ্জিনচালিত ছোট পরিবহন) ও ট্রাক্টরের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি মহাসড়ক থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে মালামাল পরিবহন করে। ফিটনেস না থাকা এসব পরিবহনে বেশিরভাগ চালকই কমবয়সী। লেবারের কাজ করতে করতেই হয়েছেন চালক। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

jagonews24

২০১৬ সালের এপ্রিলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম ট্রাক্টর মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে জেলায় চলাচলকারী ট্রাক্টর ও চালকদের নিবন্ধন, মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রলির সাইজ (সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ ফুট উচ্চতায় মালামাল গ্রহণ), শহরের নির্ধারিত রুট এবং চলাচলের সময়সহ কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিআরটিএ, ট্রাক্টর মালিক এবং পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো দুর্ভোগ, দূর্ঘটনা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রাক্টরে লুকিং গ্লাস না থাকা, ইঞ্জিনের বিকট শব্দের কারণে পেছন থেকে আসা গাড়ির অবস্থান বুঝতে না পারা, গাড়িতে চালকের সহকারী না থাকা, গাড়ির হেডলাইট দুটি একই জায়গায় হওয়ায় সামনে থেকে আসা গাড়ির ধরন বুঝতে না পারা এবং গাড়ির দুর্বল ব্রেক সিস্টেমের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে।

তবে এসবের বাইরেও মহাসড়কে রাস্তার উভয় পাশে অস্থায়ী বাজার ও যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, আঞ্চলিক সড়কগুলো সরু ও ফুটপাত না থাকা সর্বোপরি পর্যাপ্ত জায়গা বরাদ্দ না রেখে পেট্রল পাম্প স্থাপনও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

শহরের গুড়গোলা এলাকার বাসিন্দা প্রমথেস শীল বলেন, ‘দূর থেকে ট্রাক্টরগুলো এমন দানবের মতো ছুটে আসে তাতে নিজেরই ভয় লাগে। বাচ্চাদের বাইরে পাঠালে আতঙ্কে থাকি।

জেলা ট্রাক্টর মালিক সমিতির হিসাবমতে, পুরো জেলায় প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি ট্রাক্টর চলাচল করে। তবে সমিতির অন্তর্ভুক্ত আছে ৪০০টি। এ ট্রাক্টরগুলো জেলার ২৪৮টি ইটভাটা, ২৯টি বালুমহাল (অবৈধ বালুমহাল আছে প্রায় ১০-১৫টি), ৫৭২টি অটোরাইস মিল, শতাধিক করাতকল, ১১টি কোলেস্টোরের মালামালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য পরিবহনে নিয়োজিত।

jagonews24

জানা গেছে, কৃষি যন্ত্রপাতি হিসেবে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য ট্রাক্টর ইঞ্জিনগুলো আমদানি করা হয়। ইঞ্জিনগুলোকে বলা হয় হ্যারো। পরবর্তীতে ইঞ্জিনের সঙ্গে লক্ষাধিক টাকা খরচ করে গাড়ির মালিক ট্রলি যুক্ত করে মালামাল পরিবহনে ব্যবহার করেন।

পুরোনো একটি ট্রাক্টর কিনেছেন প্রভাত চন্দ্র রায়। লাইসেন্স নেই। গাড়ির লাইসেন্স করার কথা কেউ তাকে বলেনি। মহাসড়কে চলতে প্রশাসনের কোনো বাধা আসে কি না, এমন প্রশ্নে প্রভাত চন্দ্র রায় জাগো নিউজকে বলেন, মালিক সমিতি আছে। সেখানে ২০০ টাকা দিতে হয় প্রতিমাসে। সমিতি থেকে একটা টোকেন দিয়েছে। ওটা দেখালে আর কেউ বাধা দেয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক্টর মালিক বলেন, হ্যারোগুলো (ইঞ্জিন) শুধু বোরো ও আমনের সময়ে কাজে লাগে। বাকি সময়টা বসিয়ে না রেখে হ্যারোর পেছনে ট্রলি লাগিয়ে মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করি।

ট্রাক্টর মালিকদের মতো একই কথা বলছেন চালকরাও। শহরের সিটি পার্ক এলাকায় পুনর্ভবা নদী থেকে বালুভর্তি ট্রাক্টর নিয়ে যাচ্ছেন চালক ফারুক (২৬)। লাইসেন্সের কথা বলতেই পকেট থেকে টোকেন বের করে দেখালেন। জানালেন মাস্তি (মাসে ৩০০ টাকা) করা আছে তার মালিকের। কেউ আটকায় না। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রসঙ্গে তার উত্তর, হারা বেশি দূর যাই না। লাইসেন্স লাগে না হামার। জানালেন, আগে লেবার হয়ে বেলচা মারার কাজ করতেন। দুই বছর হলো ওস্তাদ স্টিয়ারিং ধরা শিখিয়েছেন।

গাড়ির মালিকদের কাছে টোকেনের মাধ্যমে অর্থগ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেন জেলা ট্রাক্টর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, প্রতি মাসে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। এ টাকা খরচ হয় শ্রমিক কল্যাণে, ঈদ ও বিভিন্ন পূজা-পার্বণে এবং শ্রমিকদের মেয়েদের বিয়েতে। উত্তোলিত টাকা অন্য কাউকে দেওয়া হয় না। গাড়িগুলোর নিবন্ধন করার বিষয়ে বলেন, নিবন্ধনের জন্য গাড়ির মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কথা শোনেন না। বিআরটিএর কোনো উদ্যোগ দেখি না।

jagonews24

জেলা ট্রাফিক ইনচার্জ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এসব যানবাহনের নিবন্ধন সংক্রান্ত কাজের দায়িত্ব বিআরটিএর। শহরে সুষ্ঠুভাবে যানচলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটছে কি না তা দেখাই হলো ট্রাফিকের কাজ। বিআরটিএ কোনো অভিযান চালালে আমাদের সহযোগিতা গ্রহণ করেন মাত্র। তিনি বলেন, মালিকপক্ষ নিজেরাই সমিতির নামে চাঁদা আদায় করেন। এ বিষয়ে ট্রাফিকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) দিনাজপুর অফিস সূত্রে জানা যায়, কৃষিকাজে ব্যবহার হওয়া ইঞ্জিন এবং ট্রলিসহ সড়কে চলাচল করার বিষয়ে দুটি পৃথক নিবন্ধন করার নিয়ম আছে। সেখানে কৃষিকাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক হাজার ৯৭৬টি ইঞ্জিনের নিবন্ধন আছে। ট্রলিসহ চলাচলকারী ট্রাক্টরগুলোর কোনো নিবন্ধন নেই।

বিআরটিএ সহকারি পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘এসব ট্রাক্টরগুলোকে নিবন্ধন করার জন্য জানানো হয় কিন্তু গুরুত্ব দেয়না। আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত কার্যক্রম পরিচালনা করি। জানালেন, জুলাই ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ৫৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৪৭৬টি গাড়ির বিপরীতে মামলা করা হয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারনেও বিআরটিএর কাজেও ধীরগতি আছে। স্বল্প সময়ে ট্রাক্টরসহ সকল অবৈধ যানবাহন মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

নিসচা দিনাজপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশিদ বলেন, পরিবারের দুই সদস্যকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছি। নিজেও পা ভেঙে প্রায় সাত মাস শয্যাশায়ী ছিলাম। বিভিন্ন সময় সংগঠন থেকে বিভিন্ন সময় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি। তার মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হলে অনেকাংশে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী জাগো নিউজকে বলেন, আগে যিনি দায়িত্বে ছিলেন তিনি কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এগুলো কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে তার খবর নেওয়া হবে। যারা এখনো আইনের আওতায় আসেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়ে পুনরায় আলোচনা করা হবে।

এমদাদুল হক মিলন/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]