ব্রিজে ওঠানামায় লাগে মই, আশ্বাসেই পার কয়েক যুগ

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৩:০৬ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০২১

খালের ওপর নির্মিত ব্রিজ। বেশ পুরোনো। দেশ স্বাধীনের আগে নির্মিত। একটা সময় এর অনেক কদর থাকলেও এখন বেশ অবহেলিত। বয়সের ভারে ব্রিজটির বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ভাঙন। রেলিংও ভেঙে গেছে। তাতেও তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু প্রধান সমস্যা দুই পাশে সংযোগ সড়ক নেই।

ব্রিজে ওঠতে দুই পাশেই মই লাগে। যার কারণে এ পথে চলাচলকারীদের ভোগান্তির যেন অন্ত নেই। যানবাহন তো দূরে থাক পায়ে হেঁটে চলাও যেন খুবই কষ্টকর। সব মিলিয়ে এ ব্রিজ পারাপার হতে গিয়ে এলাকাবাসীকে ঝুঁকি আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নিয়মিতই।

জানা গেছে, ফরিদপুরের ভাঙ্গার তুজারপুর ইউনিয়নের তুজারপুর গ্রামে স্বাধীনতার আগে ব্রিজটি নির্মিত হয়। ওই সময় থেকে এলাকার মানুষের ভাঙা উপজেলা সদরে যাতায়াতের এটিই ছিল প্রধান ও একমাত্র পথ। তখন এ ব্রিজের গুরুত্ব ছিল। মানুষ যানবাহন সবই চলতো। কিন্তু এখন বিশ্বরোড হওয়ার পর থেকে কদর কমতে থাকে এই পথের।

স্থানীয় ও আশপাশের এলাকাবাসী নিরূপায় হয়ে বাঁশের মই তৈরি করে কষ্ট আর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছে। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের কাছে ঘুরতে ঘুরতে এখন গ্রামবাসী ক্লান্ত আর ক্ষুব্ধ। শুধু আশ্বাসেই পেরিয়ে গেছে কয়েক যুগ কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে বাঁশের মই বানিয়ে কোনোমতে পায়ে হেঁটে চলছে। কৃষি জমির ফসলাদি, রাত-বিরোতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে কিংবা বৃদ্ধ-গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একাধিক মানুষ কাঁধে করে অথবা বাঁশে রশি বেঁধে কাঁধে ঝুলিয়ে ব্রিজ পার করতে হয়। এভাবে মই বেয়ে ব্রিজ পারাপার হতে গিয়ে অনেকেই আহত হয়েছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সমস্যা সমাধানে চেষ্টার কোনো কমতি নেই। কিন্তু এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। নিজেরা চাঁদা তুলে মই তৈরি করে কোনোমতে পায়ে হেঁটে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। এই ন্যুনতম বাঁশে মই তৈরির খরচ দিয়েও কেউ সাহায্য করে না। প্রতি বছর কয়েকবার এই মই তৈরি করতে হয়।

এলাকাবাসীর আক্ষেপ-হয়তো ব্রিজটির সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হোক অথবা ব্রিজ ভেঙে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাহলে আমাদের স্থায়ী একটা সমাধান হয়। সেক্ষেত্রে আমরা ভিটে-মাটি বিক্রি করে অন্যত্র বসবাসের ব্যবস্থা করতে পারি।

jagonews24

এলাকাবাসী ভোগান্তি, কষ্ট আর ঝুঁকির কথা আক্ষেপ করে জানান, এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবে অনেকেই আশার আলো ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় বাড়ি-ঘর তৈরি করে বসবাসের চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান (৬৫) বলেন, এই ব্রিজটি পাকিস্তান আমলের তৈরি। একটা সময় এই ব্রিজ পার হয়ে এই রাস্তা দিয়ে আমরাসহ অঞ্চলের মানুষের ভাঙ্গা উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের একমাত্র পথ ছিল। আগে বেশ বড় বন্যা হতো। বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে বন্যার কারণে তীব্র স্রোতে মাটি সরে গেছে ব্রিজের দুই পাশ থেকে। একটা সময় ভাঙ্গা যাওয়ার প্রধান রাস্তা ও ব্রিজ দিয়ে মানুষজন ও ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করতো। বিশ্বরোড হওয়ার পর থেকে এর কদর কমে গেছে।

এ ব্যপারে ব্রিজ সংলগ্ন বাসিন্দা ওমর আলী সেখ (৫৫) জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ২১ বছর আগে অন্য জায়গা থেকে এখানে এসে বাড়ি-ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছি। এছাড়া আমাদের দেখাদেখি আরও বেশ কয়েকটি পরিবার এখানে এসে বসতি শুরু করে। কিন্তু কোনো মেম্বার চেয়ারম্যান এই ব্রিজের সংযোগ সড়কে এক ঝুড়ি মাটি দেই নাই। সব সমস্যা আর সব ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে আমাদের।

তিনি বলেন, চলতে গিয়ে অনেকেই হাত-পা-কোমর ভেঙে আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। অনেকবার মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেও কোনো কাজ হয়নি। এখন আমরা দুই পাসের লোকজন চাঁদা তুলে ব্রিজে ওঠার জন্য বাঁশ কিনে সাঁকোর মতো করে দিয়েছি।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম (৪৫) জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের আসল সমস্যা হচ্ছে কেউ যদি অসুস্থ হয়, কোনো গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে হলে চরম ভোগান্তি-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়।

শাহিন মোল্লা (২৮) বলেন, আমাদের সবার অনেক জমি খালের ওপার পাশে। যার কারণে আমাদের ফসল ঘরে তোলার সময় মারাত্মক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও আমরা কোনো উপকার পাচ্ছি না। অবিলম্বে দ্রুত ব্রিজের দুই পাশে সংযোগ সড়কের দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা উপজেলা প্রকৌশলী (স্থানীয় সরকার বিভাগ) আব্দুল মালেক মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, তুজারপুর এই রকম একটা ব্রিজ আছে এটা আমার জানা নেই।

এ ব্যাপারে তুজারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরিমল চন্দ্র দাস জাগো নিউজকে বলেন, এটি ব্রিটিশ আমলের নির্মিত একটি ব্রিজ। এ রাস্তা এবং ব্রিজটি দিয়ে আগের মতো তেমন কোনো লোকজন যাতায়াত করে না। তবে ওখানে কয়েকটি পরিবার বসবাস করে। এছাড়াও মাঠ থেকে কৃষকরা এ পথে বিভিন্ন ফসল আনা নেওয়া করে। যদি সরকার উদ্যোগ নেয়, তাহলে সংযোগ সড়ক ও ব্রিজটির সংস্করণ করা যেতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমার জানা ছিল না, আপনাদের মাধ্যমে জানলাম এই ব্রিজের খবর। আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে খুব দ্রুত এই ব্রিজ সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। ব্রিজের দুই প্রান্তে মাটি ভরাট করে চলাচলের উপযোগী করা হবে।

এমআরএম/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]