৩ বছরে পিয়ন থেকে কোটিপতি

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১০:১৬ এএম, ২০ নভেম্বর ২০২১

কক্সবাজারের মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদু রাজ্জাক ওরফে বার্মা রাজ্জাক (৫৮) তিনবেলা খাবার যোগাতে এখনও দিনমজুরের কাজ করছেন। তার স্ত্রী শাহেনা বেগমও দীর্ঘ বছর ধরে ঝিয়ের কাজ করেন পরের বাড়িতে। এক সময় ছেলে মহিউদ্দিনকে হোটেল-মোটেল জোনের এক লন্ড্রিতে সহকারীর কাজে দেয়া হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে আবাসিক হোটেলে পিয়নের কাজ করেছেন ২০১৭ সালেও। মাইনে পেতেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা।

কিন্তু গত তিন বছরের ব্যবধানে রহস্যজনকভাবে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন ‘পিয়ন মহিউদ্দিন’। করোনাকালেও হোটেল-মোটেল জোনের ‘অঘোষিত জমিদার’ ছিলেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শতাধিক বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট। নামে-বেনামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়।

সম্প্রতি এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর তাকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্যের। তার ‘আলাদিনের চেরাগ’ কী তা জানতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সূত্রমতে, হোটেল-মোটেল জোনে মহিউদ্দিনের প্রায় শতাধিক বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট রয়েছে। যা মোটা অংকের বিনিময়ে বন্ধক ও বিভিন্ন মেয়াদে ভাড়া নিয়েছেন তিনি। এসব ফ্ল্যাট ব্যবসায় তিনি অন্তত ৬ কোটি টাকা বিনোয়োগ করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও নামে-বেনামে রয়েছে আরো অনেক সম্পদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে গণপূর্ত ১নং ভবনে ১০টি, গণপূর্ত ২নং ভবনে ২৭টি, গণপূর্ত ৫নং ভবনে ৪টি, গণপূর্ত ৯নং ভবনে ৫টি, হোটেল সি-পার্লে ৩টি, হাইপেরিয়ান সি ওয়েভ হোটেলে ১৮টিসহ ৬৭টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট মহিউদ্দীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া আরো কয়েকটি বিলাসবহুল ভবনে নামে-বেনামে রয়েছে অন্তত ৩০টি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট।

নাম প্রকাশ না করে এসব ফ্ল্যাটের মালিক পক্ষের কয়েকজন জানান, তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ফ্ল্যাটের মধ্যে ২০-৩০টি মহিউদ্দিন ১০-২০ লাখ টাকায় বন্ধক হিসেবে নিয়েছেন। বন্ধক থাকায় এসব ফ্ল্যাটের এখন ভাড়া দিতে হয় না। বাকি ফ্ল্যাটগুলো তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিয়ে মাসিক ১৫-২০ হাজার টাকায় মাসিক ভাড়া নিয়েছেন। এসব ফ্লাটের জন্য তার প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

এছাড়াও অন্তত ৫টি ফ্ল্যাট মহিউদ্দিন কিনে নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা। এসব ফ্ল্যাটের মধ্যে অন্তত ৫০টি ফ্ল্যাট রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক এনজিও সংস্থায় কর্মরত বিদেশিদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন।

jagonews24

মহিউদ্দিনের বাবার বাড়ি মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদু খালেক জানান, মহিউদ্দিন রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেলেও সংসার চালাতে তার বাবা আবদু রাজ্জাক এখনো দিনমজুরী করছেন। তার মা শাহেনা বেগম দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত নজরুল ইসলামের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে আসছেন।

মহিউদ্দিন মহেশখালীতেও কোটি টাকা মূলের কয়েকটি জায়গা কিনেছেন উল্লেখ করে তার উত্থান কিভাবে তা জানা নেই বলে উল্লেখ করেন এ জনপ্রতিনিধি।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনের ব্যবসায়ীদের দাবি, করোনাকালে পর্যটন বন্ধ থাকায় লোকসানের কারণে যেখানে অনেকেই হোটেল-ফ্ল্যাট ছেড়ে ছিতে বাধ্য হয়েছেন, সেখানে মহিউদ্দিনের চিত্র ছিল ভিন্ন। তিনি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দিগুণ জামানত ও চড়া ভাড়ায় ৩০ থেকে ৪০টি ফ্ল্যাট নিজের কব্জায় নিয়েছেন। এতে রীতিমতো বিস্মিত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তার গায়েবী আয়ের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়ে মহিউদ্দিন ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করেন অনেকে।

মুঠোফোনে জানতে চাইলে আর্থিক অনটনে ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন হোটেলে চাকরি করেছেন স্বীকার করে মহিউদ্দিন বলেন, মানুষের কি টাকা-পয়সা হতে পারে না? আমারও হয়েছে। আমি বিদেশিদের ৩০টি ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছি। একটি ফ্ল্যাটে গড়ে ৫০ হাজার করে সেখান থেকে অন্তত ১৫ লাখ টাকা মাসে আয় হয় আমার।

তবে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয় দাবি করলেও এত সংখ্যক ফ্ল্যাট ব্যবসায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের উৎস সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

এমনকি ফোন কেটে দেয়ার পর ঢাকার এক সিনিয়র সাংবাদিককে দিয়ে নিউজটি প্রকাশ না করতে প্রতিবেদকের কাছে তদবীরও করান মহিউদ্দিন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর এক কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনের যে কয়েকজনের আয়ের উৎসের খোঁজ নেয়া হচ্ছে তাদের মধ্যে মহিউদ্দিনের নামও রয়েছে। আয়কর অফিসে তার ফাইল আছে কিনা তা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মহিউদ্দিনের মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। প্রমাণ পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।