‘নৌকায় ভোট দেওয়ায়’ যশোরে শতাধিক বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৯:৩৬ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০২১

‘ঘর ভাঙচুর করে কোলের দেড় মাসের বাচ্চার দিকে হাত বাড়িয়ে হামলাকারীরা বললো, নৌকায় ভোট দিস? বাচ্চা দে, আছাড় মেরে দিই, তাইলে তোর স্বামীর খোঁজ পাওয়া যাবে’।

যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর কলোনিতে ভাঙাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন তাসলিমা বেগম। পরে হাত-পা ধরে নিজের ও সন্তানের প্রাণ বাঁচান তিনি। তবে সকালে স্বামী জামাল হোসেনকে খুঁজতে আসবেন বলে হুমকি দিয়ে গেছেন তারা।

ট্রলিচালক মিঠুন হোসেনের স্ত্রী জেসমিন খাতুন বলেন, তাদের বাড়ি, দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভয়ে স্বামী বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

jagonews24

যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। রোববার (২৮ নভেম্বর) রাতে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিজয় মিছিল থেকে এ হামলা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এই ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ইলিয়াস কবির বকুলকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী আনারস প্রতীকের আব্দুল খালেক। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, নৌকায় ভোট দেওয়ায় তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন বিজয়ী আব্দুল খালেকের কর্মী-সমর্থকরা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ভোটগণনা শেষে রোববার রাতে ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর কলোনিতে আনারস প্রতীকের বিজয় মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে ফেরার পথে নৌকার সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

jagonews24

তারা জানান, এই পাড়াতেই অন্তত ১০টি বাড়ি, দোকানপাট, মিনিবাস, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল। এসময় অন্তত ১০ জন আহত হন। এলাকার পুরুষরা ভয়ে পালিয়েছেন। ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাড়িগুলোতে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছেন।

এলাকার বৃদ্ধ গনি পাঠান বলেন, তার ছেলে সুখচান নৌকায় ভোট দেওয়ায় তার বাড়ির সামনে বোমা মারা হয়েছে। কুপিয়ে-পিটিয়ে টিনের ঘরটি যাচ্ছেতাই করা হয়েছে। ধারদেনা করে ঘরটি তৈরি করা হয়েছিল। এখনও দেনা শোধ হয়নি বলে জানান তিনি।

নাসির উদ্দিনের স্ত্রী নুরনাহার অভিযোগ করেন, আব্দুল খালেকের লোকজন সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে নিয়ে এসে হামলা চালিয়েছেন। হামলাকারীদের সঙ্গে দুজন পুলিশও ছিলেন। তারা কোনো ভূমিকা রাখেননি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

jagonews24

বৃদ্ধা ফাতেমা বেগম হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। তার উঠানে ভাঙা অবস্থায় পড়ে ছিল মিনিবাস। বিদেশ থেকে মেয়ের পাঠানো টাকায় গাড়িটি কেনা। সেটি ভাঙার পর বাড়ির দরজা-জানালে ভেঙে তছনছ করেছে হামলাকারীরা। ওই সময় বৃদ্ধা ফাতেমা ঘরে শুয়ে ছিলেন। ভাঙা কাচে তার কপাল কেটে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু দুই নম্বর কলোনিতেই নয় হামলার ঘটনা ঘটেছে ২ নম্বর ওয়ার্ডের পিপড়াগাছি গ্রামের মহিষাকুড়া এলাকায়। সবমিলিয়ে অন্তত শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহিষাকুড়া বাজারে নৌকার নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা ভাঙচুর চালিয়ে নৌকার প্রতিকৃতি খুলে এনে আনারসের কার্যালয়ের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাগআঁচড়া ইউনিয়নে পরাজিত নৌকার প্রার্থী ইলিয়াস কবির বকুল অভিযোগ করেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বাচনে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এরপর বিএনপি-জামায়াতের লোকজন এনে আনারসকে বিজয়ী করা হয়েছে। ফলাফল ঘোষণার পর তার কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরসহ তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ভয়ে কর্মী-সমর্থকরা বাড়ি থাকতে পারছেন না।

jagonews24

তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল খালেক। তার দাবি, প্রত্যেক ওয়ার্ডে সাত থেকে আটজন মেম্বার প্রার্থী ছিলেন। তাদের সমর্থকরাই বিরোধে সংঘর্ষ-ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি এলাকায় পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে তিনি কোনো দায় নেবেন না। অপরাধীদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে।

তিনি আরও দাবি করেন, তিনি নিজেই হামলার শিকার হয়েছেন। তার কর্মী-সমর্থকরাও আহত হয়েছেন বলে জানান নবনির্বাচিত এ চেয়ারম্যান।

সোমবার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

যশোর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নাভারণ সার্কেল) জুয়েল ইমরান সাংবাদিকদের বলেন, যেসব এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেসব এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ গ্রহণসহ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবেও তিনি উল্লেখ করেন।

মিলন রহমান/এসআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]