পাহাড়ের শরীরজুড়ে কেবল আঘাতের চিহ্ন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাঙ্গামাটি
প্রকাশিত: ০২:৪১ পিএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২২

রাঙ্গামাটির শহরতলী রাঙ্গাপানি। শহরের পাশে রাঙ্গাপানির লুম্বিনী পাড়ায় পাহাড়ি পরিবেশে গ্রামীণ জনজীবন। এলাকার বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজ, জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরো এলাকা জুড়ে সারি সারি পাহাড়। পাহাড় জুড়ে কেউ করেছে মিশ্র ফলের বাগান আবার অনেক পাহাড় জঙ্গলে আবৃত।

লুম্বিনী পাড়ার একেবারে শেষে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো সবুজ পাহাড়ে খনন যন্ত্রের দাগ। শুধু একটা পাহাড় নয়; কয়েকটা পাহাড় কেটে একেবারে মাঠ তৈরি করা হয়েছে। পিছনে গিয়ে দেখা যায় আরো পাহাড় কাটা চলছে। শরীরজুড়ে যেন আঘাতের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়গুলো।

সম্প্রতি লুম্বিনী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পিচঢালা পুরো সড়কটিতেই মাটির আস্তরণ। বোঝাই যাচ্ছে মাটি পরিবহন করতে গিয়ে গাড়ি থেকে মাটি পড়ে পুরো সড়কটিতে এ আস্তরণ পড়েছে। ধুলামিশ্রিত সড়কটি ধরে একেবারে শেষ মাথায় যাওয়ার পর দেখা মেলে সবুজের মাঝে পাহাড় কাটার ক্ষতচিহ্ন।

সড়কের পাশেই পুরো কয়েকটি পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। দেখলে মনে হবে কোনো একটা মাঠ। মাঠ পেরোলেই পেছনের পাহাড়ের দিকে উঠলে আরো বিশাল কর্মযজ্ঞ। যেখানে আরো কাটা হচ্ছে সবুজ পাহাড়। এক-দুইটি পাহাড় নয়; অন্তত সাত-আটটি পাহাড়ে পড়েছে খননযন্ত্রের দাগ। পাহাড় কাটা অংশে প্রবেশ না করার জন্য ইতোমধ্যে অস্থায়ীভাবে খুঁটি গেড়ে সীমানা প্রাচীর এবং গেট দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে চলছে এই পাহাড় কাটার উৎসব।

jagonews24

শুধু এই পাহাড়গুলো নয়; পিচঢালা সড়কের উভয় পাশে চলছে পাহাড় কাটা। স্থানীয়রা এসব পাহাড়ে তাদের গরু-ছাগল ছেড়ে দিলেও এখন পাহাড় কেটে মাঠ হয়ে যাওয়ার কারণে কাটা পাহাড় পিছনে ফেলে আরো কিছু দূরে গরু-ছাগল ছেড়ে দিতে হচ্ছে খাদ্যের জন্য।

পুরো এলাকা ঘুরে কাউকে পাওয়া না গেলেও গরু-ছাগল নিয়ে আসা কয়েকজন স্থানীয়কে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা ‘কিছুই জানেন না’ বলে এড়িয়ে যান। তবে তাদের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘শুনেছি হাউজিং প্রকল্প করবে, এজন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে, আগে এসব পাহাড়ে গরু-ছাগলের খাদ্যের জন্য ছেড়ে দিলেও এখন পাহাড় কাটায় আরো অনেক দূরে গিয়ে গরু ছাগল ছেড়ে দিতে হচ্ছে। পরিশ্রম বেড়েছে।’

শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, এই পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মোহন চান দেওয়ান। পাহাড়টির তিনিই মালিক। তবে একক মালিক নন; আরো কয়েকজন এসব পাহাড়ের মালিক।

মোহন চান দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সব জায়গাই উঁচু-নিচু পাহাড়। সামান্য বৃষ্টি পড়লেই পাহাড় কাটতে হয়। নিজেদের জায়গা কাটা হচ্ছে, এজন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাছাড়া প্রশাসন থেকেও আমাদের কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। পাহাড়টি পতিত অবস্থায় ছিল, তাই এটি কেটে সমান করা হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন ফলের চারা রোপণ ও খামার করার কথা ভেবেছি। তাই পাহাড়ের উপরিঅংশ কেটে কিছুটা সমান করা হচ্ছে। পাহাড়ের মাটির কিছু অংশ জায়গা সমান করার কাজে আর কিছু মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা মাটির দামও বেশি নিচ্ছি না।

jagonews24

মোহন চানের দাবি, এসব জমির মালিক তিনি একা নন। সেখানে আরো কয়েকজনের জায়গা রয়েছে। তারা মোহন চান দেওয়ানের আত্মীয়। তবে তিনি আত্মীয়দের পরিচয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। যেহেতু সবাই পাহাড় কাটে তাই তিনিও পাহাড় কাটছেন বলে জানান।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের সংগঠক হেফাজত সবুজ বলেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে অতীতে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। পাহাড় কাটার ফল হিসেবে ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতেই মৃত্যুবরণ করে ১২০ জন। তাই রাঙামাটিতে কোনোভাবেই পাহাড় কাটা উচিত নয়।

তিনি বলেন, লুম্বিনী পাড়ায় যে পাহাড় কাটা হচ্ছে সেটা আমিও দেখেছি, শহরের পাশেই পৌর এলাকার মধ্যে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিভাবে এতো পাহাড় কাটা হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। এ যেন পাহাড় কাটার উৎসব!

রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন রুবেল এই বিষয়ে বলেন, পাহাড়ের প্রতিবেশ রক্ষার জন্য পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। যারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পাহাড় কাটছে তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

jagonews24

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পাহাড় কাটার বিষয়ে প্রশাসন খুবই কঠোর। কোনোভাবে পাহাড় কাটতে দেওয়া হবে না। সদর ইউএনওকে বলা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য।

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা বিনতে আমিন বলেন, বিষয়টি জানার পর ইতোমধ্যে আমি স্পটে গিয়েছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রসেসিংয়ে আছি। এই বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।

শংকর হোড়/এফএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]