মিজানের থমকে থাকা জীবনে ভালোবাসা এলো ভিন্নভাবে
ফরিদপুর পৌরসভার বাসিন্দা মিজান তালুকদার (৩৩)। পেশায় ছিলেন একজন অটোরিকশা চালক। ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। তাই সিদ্ধান্ত নেন পিকআপের হেলপার হবেন। প্রথমদিন কাজে গিয়েই সড়ক দুর্ঘটনায় বাম পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন তিনি। এরপরই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।
সংসারের খরচ চালানো তো দূরের কথা নিজের চিকিৎসা চালাতেও কষ্টসাধ্য হয়ে মিজানের তার। ফলে গত সাড়ে চারমাস ধরে অসহায় জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তার পরিবারকে। তবে ভালোবাসা দিবসে তার থমকে থাকা জীবনে ভালোবাসা এলো ভিন্নভাবে। জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকান ঘর উপহার পেয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ফরিদপুরের সেচ্ছাসেবী সংগঠন আমরা করবো জয়ের উপহার দেওয়া দোকানটির উদ্বোধন করা হয়। দোকান চালিয়ে আবারো সংসারের হাল ধরতে পারবেন এই ভেবে খুশিতে আত্মহারা মিজান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর শহরের উত্তর আলীপুর রেললাইনের পাশে বসবাসকারী রেজাউল করিম তালুকদারের বড় ছেলে মিজান তালুকদার (৩৩)। তিনি দুই কন্যা সন্তানের বাবা। গত বছরের ২ অক্টোবর ছিল তার হেলপারির প্রথম দিন। সন্ধ্যায় ফরিদপুরের কানাইপুর বাজার থেকে পিকআপে পানবোঝাই করে রওনা দেন যশোরের উদ্দেশ্যে।
দিনগত রাত ২টার দিকে যশোরের চৌরাশ এলাকায় কাভার্ডভ্যানের সাথে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন পিকআপচালক মো. সোহেল ও হেলপার মিজান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল, শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট, ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেন। পিকআপচালক সোহেলের কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় তিনি এখনো পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় করার পরও বাম পা কেটে ফেলতে হয় তার। শুরু হয় তার পঙ্গুজীবন। একই সঙ্গে প্রতিদিন ৮০০ টাকার ওষুধ খেতে হয় মিজানকে।
দোকানঘরে ‘আমরা করবো জয়’ সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে মিজান তালুকদার
এমন সময় ‘আমরা করবো জয়’ সংগঠনের সভাপতি আহমেদ সৌরভ মিজানের করুণ কাহিনি শুনে ছুটে যান তার বাড়িতে। মিজানের কাছে শোনেন তার কী প্রয়োজন। মিজান বলেন, আমাকে একটি দোকানঘর করে দিলে সংসার চালাতে পারতাম।
আহমেদ সৌরভ মিজানের দোকানঘর নির্মাণের অর্থসহায়তা শুরু করলে আমেরিকা প্রবাসী ব্যবসায়ী গোলাম সামধানী খান ৫০ হাজার টাকা সহায়তা করেন। টিন, কাঠ, সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে বাড়ির সামনেই রাস্তার পাশে দোকানঘর নির্মাণ করা হয়। কিনে দেওয়া হয় দোকানের মালামাল।
সংগঠনের সভাপতি আহমেদ সৌরভ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা সবসময় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। মিজান একজন আত্মনির্ভরশীল মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন তার জন্য একটা দোকান করে দিতে। আমরা তার মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আনন্দিত।’
মিজান তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার দুর্ঘটনার সময় চিকিৎসার জন্য প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। দুর্ঘটনা আমার জীবনকে অসহায় করে তুলেছিল। এমন সময় মানবিক ভাইগুলো আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার থমকে যাওয়া জীবনকে আবার গতিশীল করে দেয়। আমি তাদের মঙ্গল কামনা করি। কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের।’
সমাজসেবক কাজী গোলাম মহিউদ্দিন তসলিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি তার জন্য বিনামূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করে দেবো।’
পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সামছুল আরেফিন সাগর জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা করবো জয় একটি মানবিক সেচ্ছাসেবী সংগঠন। আমি মিজানকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনার জন্য কাগজপত্র জমা দিয়েছি।’
এন কে বি নয়ন/এসজে/এএসএম