তেঁতুলতলার রসগোল্লা খাননি ফরিদপুরে এমন মানুষ মেলা ভার

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১১:৩০ এএম, ২৪ মার্চ ২০২২

সেই ১৯৫০ সাল থেকে শুরু। শুরুতে শিঙাড়া, ডালপুরি, রসগোল্লা ও নিমকি বিক্রি করা হতো। দোকানের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ছবদার হোসেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে মো. জহুরুল হক খোকা মিয়া দোকানের দায়িত্ব পান। পরে দোকান ও মিষ্টির নাম হয় ‘খোকা মিয়ার মিষ্টির দোকান’। প্রায় ৭২ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী তেঁতুলতলার মিষ্টির শুরুর গল্পটা এমনই। এখন সবার কাছে ‘তেঁতুলতলার মিষ্টি’ নামেই বেশি পরিচিত।

ফরিদপুর শহরের কমলাপুরে এই মিষ্টির দোকান অবস্থিত। আদি নাম খোকা মিয়ার মিষ্টি হলেও স্থানীয়রা একে ‘তেঁতুলতলার মিষ্টি’ বলেই জানে। মূলত দোকানটি কমলাপুর তেঁতুলতলা মোড়ে হওয়ায় ‘তেঁতুলতলার মিষ্টি’ নামটা বেশি পরিচিতি পেয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরে এই তেঁতুলতলার রসগোল্লা ও মিষ্টি খেয়ে প্রশংসা করেননি এমন লোকের সংখ্যা মেলা ভার। এর সুনাম ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রয়েছে এর সুনাম। ভারত, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আপনজনদের জন্য প্রায়ই এই মিষ্টি নিয়ে যান তাদের স্বজনরা। এসব কথা শুধু দোকাদার নয়, বিভিন্ন মানুষের মুখেও শোনা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাটি-কাঠের চুলায় প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ মণ দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় ছানা। একদিন আগের ছানার পানি তাতে মেশানো হয়। তারপর তা দিয়ে বানানো হয় মিষ্টি। দুধ সংগ্রহ করা হয় শহরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও চর এলাকার দেশি গরু থেকে। এখানকার রসগোল্লার মূলত চাহিদা বেশি। পাশাপাশি কালোজাম ও নিমকিও বানানো হয়। প্রতিটি রসগোল্লা ১০ টাকা দরে ও প্রতি কেজি ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

jagonews24

এখানে খোকা মিয়ার মিষ্টির দোকান ছাড়াও ছোট-বড় মিলিয়ে সাতটি মিষ্টির দোকান আছে। তবে অন্য দোকানের চেয়ে খোকা মিয়ার মিষ্টির দোকানের সুনাম আর নামডাক বেশি। অন্য দোকানগুলোতেও মোটামুটি বিক্রি হয়।

এক সময় খোকা মিয়ার পরিবারের সদস্যরাই মিষ্টি বানাতেন ও বিক্রির কাজ করতেন। এখন চাহিদা বেড়েছে, এ কারণে তিনজন কারিগর মিষ্টি তৈরির কাজ করেন। বিক্রির কাজও তারাই করেন।

শহরের সাদিপুর এলাকার বাসিন্দা মো. ইমরান হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, তেঁতুলতলার মিষ্টি নামে ও মানে বেশ প্রসিদ্ধ, স্বাদেও এই রসগোল্লার জুড়ি নেই। চার-পাঁচটিতেও মুখ ফেরে না। প্রতিদিন বহু দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্যক লোকের আগমন ঘটে এখানে। মানুষজন খেয়ে যান আবার নিয়ে যান এই মিষ্টি।

প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু আর খোলা থাকে রাত ৮টা পর্যন্ত। দিনে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার পিস মিষ্টি তৈরি করা হয় দোকানে। আকারে ছোট। নরম তুলতুলে। এসব রসগোল্লা কেজিতে নয়, বিক্রি হয় পিস হিসেবে। প্রতিটির দাম ১০ টাকা। আর প্রতিটি নিমকির দাম মাত্র ৫ টাকা। সব মিলিয়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মিষ্টি, নিমকি বিক্রি হয়।

তেঁতুলতলার সবচেয়ে পুরনো এই দোকানটির বর্তমান অবস্থা দেখে নতুন যেকোনো ক্রেতার অপছন্দ হতে পারে। কোনো ডেকোরেশন- চাকচিক্য নেই। নেই ভালো কোনো চেয়ার-টেবিল। প্লেট-গ্লাসেও নেই আধুনিকতা। দোকানের এক পাশেই মাটির তৈরি বড় আকারের চুলা। লাকড়ি-কাঠের হালকা তাপের আগুনেই বানানো হয় রসগোল্লা। সবকিছুই যেন সেকেলে। তারপরও পুরনো ক্রেতাদের নেই কোনো অভিযোগ-অনুযোগ।

jagonews24

সারাদিন কম-বেশি যাই বিক্রি হোক বিকেলের পর ভিড় জমে। কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চে জায়গা খালি পেতেও অপেক্ষা করতে হয়।

প্রয়াত খোকা মিঞার হাতে প্রতিষ্ঠিত দোকানটির নাম হয়েছে তার নামেই। খোকা মিঞার অবর্তমানে তার দুই ছেলে মো. আমিন হোসেন ও শহিদুল ইসলাম এবং নাতি অনিক মিলেই দোকান চালান। তবে খোকা মিয়ার মিষ্টির দোকানের দেখাশোনার মূল দায়িত্বে রয়েছেন ছেলে আমিন হোসেন। শহরের কমলাপুরে তাদের পরিবারের বসবাস। খোকা মিয়ার মৃত্যুর পর থেকে তিনিই এই দোকানের পরিচালক হিসেবে আছেন।

মো. আমিন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৫০ সালে আমার বাবা খোকা মিয়া কমলাপুরে দোকান শুরু করেন। তিনিই এখানে প্রথম মিষ্টির দোকান দেন এবং নিজে হাতে রসগোল্লা বানাতেন। তখন এত দোকান ছিল না। বাজার-ঘাটও এত জমজমাট ছিল না। মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় হাতে গোনা।

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালের পর থেকেই মূলত দোকানের সুনাম ও প্রসার হয়। কোনো ধরনের প্রচারণা কিংবা বিজ্ঞাপন নয়, লোকমুখে প্রশংসা থেকেই এই জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসা ঠিকমতো না চললেও নিয়মিত কর পরিশোধ করতে হয়েছে। আবার বেড়েছে অন্যান্য খরচ। সার্বিক দিক বিবেচনা করে দোকানের পরিসর বাড়ানো, ডেকোরেশন পরিবর্তন, পরিবেশ আরও উন্নত করে তোলার মতো বিষয়গুলো তাদের পরিকল্পনায় আছে বলেও তিনি জানান।

সাধারণ টেবিল ও বেঞ্চে বসে গরম রসগোল্লার সঙ্গে নিমকি খাচ্ছেন মধুখালী উপজেলার মির্জা প্রিন্স, সাইফুল ইসলামসহ বেশ কয়েক যুবক।

jagonews24

তারা জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের বাড়ি প্রায় ৩০ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। তেঁতুল তলার মিষ্টি বিশেষ করে রসগোল্লার বেশ যশ-খ্যাতি রয়েছে। দীর্ঘদিন আগে থেকেই রসগোল্লা খেয়ে থাকি। শহরে এলে সময়-সুযোগ পেলেই চলে আসি রসগোল্লা আর নিমকি খেতে। স্বাদে-মানে বেশ। আর দামেও কম। আবার বাড়ির জন্যও নিয়ে যাই।

দোকানে মিষ্টি বানানো ও মিষ্টি বিক্রির কাজে নিয়োজিত রাজীব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, প্রতি পিস দশ টাকা। কেজি হিসেবে বিক্রি না করার কারণ হিসেবে বলেন, মিষ্টির রসের জন্য কেজি প্রতি মিষ্টির সংখ্যায় হেরফের হয়। এমনটা যেন না হয় সেজন্যই পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, অর্ডারের মাধ্যমে আট হাজার পিস মিষ্টি একসঙ্গে বিক্রির রেকর্ডও আছে। এছাড়া গড়ে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার পিস মিষ্টি বিক্রি হয় প্রতিদিন। মিষ্টি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে নিয়মিত এক মণ ছানা ও ছয় থেকে সাত মণ দুধের প্রয়োজন হয়।

এদিকে তেঁতুলতলায় খোকা মিয়ার মিষ্টির দোকানসহ সাতটি দোকান রয়েছে। তারমধ্যে আরো দুইটা মিষ্টির দোকান বিখ্যাত। একটি মোল্লার মিষ্টি অন্যটি খলিলের মিষ্টি।

সালথা উপজেলার বাসিন্দা ও সমাজকর্মী ইকবাল মাহমুদ ইমন জাগো নিউজকে বলেন, ৯০ দশক থেকে তেঁতুলতলার মিষ্টির সুনাম শুনে আসছি ও খেয়ে আসছি। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে প্রায়ই এ মিষ্টি খাওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানতো বটেই। প্রবাসীদের জন্যও তাদের আত্মীয়-স্বজন এখানকার মিষ্টি বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠিয়ে থাকেন।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ফরিদপুর জেলার সভাপতি শেখ ফয়েজ আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, এখন পর্যন্ত তেঁতুলতলার মিষ্টির স্বাদ ও মান ঠিক আছে। তবে তাদের মান-যশ ও সুনাম ধরে রাখতে হলে ভেজালমুক্ত মিষ্টি তৈরির দিক খেয়াল রাখতে হবে।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।