দুই পরিচয়ে নারীর পৃথক মামলা: ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আদালতের
ছেনুয়ারা বেগম (২৬) টেকনাফের নয়াপড়ার মুচনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্লক এইচ’র শেড ৬৪৬/২নং রুমের মৃত শফি উল্লাহর মেয়ে। ২০১৯ সালে তার স্বামী মো. রায়হানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যৌতুকের মামলা করেন ছেনুয়ারা। তবে মামলাটি তদন্ত করে সত্যতা না পাওয়ায় আদালত সেটি খারিজ করে দেন।
কিন্তু সেই ছেনুয়ারা বেগমই এক বছর পর হয়ে যান কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালি ইউনিয়নের পশ্চিম পাড়ার মৃত ছব্বির আহমদের মেয়ে লতিফা বেগম (২৭)। এই পরিচয়ে ২০২০ সালে ফের মামলা করেন আগের মামলায় খালাস পাওয়া রায়হানের বিরুদ্ধে। এবার অভিযোগ প্রতারণামূলক ভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের।
টেকনাফ আদালতে দায়ের করা মামলায় আগের মামলার তথ্য গোপন করার পাশাপাশি নিজের মিথ্যা তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেছেন বাদী। পাশাপাশি মামলার আইও বাদীর পরিচয় আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এসব বিষর উল্লেখ করে মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) বিকেলে মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর মোহম্মদ ফারুকী।
আদালতের এমন নির্দেশনার কথা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী খালেক নেওয়াজ।
তিনি বলেন, একই নারী আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন নামে দুটি মামলা দায়ের করেন। প্রথম মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও দ্বিতীয় মামলায় আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটের কোথাও ওই নারীর আগের মামলার তথ্য ও ভিন্ন পরিচয়ের বিষয়টি তুলে ধরেননি।
মঙ্গলবার মামলাটির চার্জ গঠনের দিন থাকলেও আমরা বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করি। পরে আদালত আমাদের আবেদন আমলে নিয়ে বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সূত্র জানায়, ৫ এপ্রিল টেকনাফ আদালতের সিআর-৪৯/২০২০ মামলার ধার্য্য তারিখ ছিল। এই মামলার বাদী লতিফা বেগম। আসামি রায়হান। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই এর এএসআই (নি.) আবু তাহের।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বাদী লতিফা বেগম আসামি মো. রায়হানের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলকভাবে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে মামলাটি আদালতে দায়ের করেন। মামলাটির চার্জ শুনারির জন্য দিন ধার্য্য ছিল। কিন্তু বাদী লতিফা বেগম ইতোপূর্বে রোহিঙ্গা শরনার্থী পরিচয়ে ছেনুয়ারা বেগম নাম ধারণ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আসামি মো. রায়হানের বিরুদ্ধে স্বামী হিসেবে যৌতুক দাবির অভিযোগে সিপি-৩৪৮/২০১৯ নং মামলা দায়ের করেন। যা তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উক্ত মামলা খারিজ করা হয়।
অতঃপর একই বাদী বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে লতিফা বেগম নামে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর- ৪৯/২০২০(টেকনাফ) মামলা দায়ের করলে অভিযোগ শুনানির পর্যায়ে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আসামিপক্ষ বর্ণিত বিষয়টি উপস্থাপন করে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাজাহান এলাহি নূরী বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদন আমলে নিয়ে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আলমগীর মুহাম্মদ ফারুকী সংশ্লিষ্ট নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন চান। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী বাদী রোহিঙ্গা নাগরিক এবং তিনি ক্যাম্পেই বাস করেন।
ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বর্ণিত মামলার বাদী লতিফা বেগম উক্ত শরণার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গা পরিচয়ে ছেনুয়ারা বেগম নাম ধারণ করে সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে আসছেন। তাছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বাদীর নিয়োজিত আইনজীবী মো. হারুন অর রশিদের বক্তব্য নেন আদালত।
আইনজীবী হারুন অর রশিদ আদালতকে জানান, সিআর-৪৯/২০২০ (টেকনাফ) মামলার বাদী লতিফা বেগম এবং সিপি-৩৪৮/১৯ মামলার বাদী ছেনুয়ারা বেগম একই ব্যক্তি এবং তিনি দুটি মামলায় ভিন্ন ভিন্ন নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। পরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বাদীকে ব্যাখ্যা প্রদান করার নির্দেশ দিলে বাদী লতিফা বেগম তার জন্মসনদ ও তার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দাখিল করেন। উক্ত দলিলদ্বয় পর্যালোচনায় বাদী লতিফা বেগম বাংলাদেশি নাগরিক। কিন্তু লতিফার ভিন্ন ভিন্ন নামের কারণে কোন পরিচয় সত্য তা নির্ণয় ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন। অধিকন্তু সিআর-৪৯/২০২০ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদনে বাদী লতিফা বেগমকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি এনজিও সংস্থার ভোলন্টিয়ার হিসেবে চাকরিরত মর্মে উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তে বাদীর প্রকৃত পরিচয় উদঘাটনে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং বাদীর রোহিঙ্গা পরিচয় উদঘাটন না করে ভিন্নরূপ তদন্ত করায় এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবগতির জন্য আদালত কর্তৃক আদেশের কপি পাঠানো হয়।
এসব বিষয়ে জানতে মামলা দুটির বাদী ছেনুয়ারা ওরফে লতিফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি কোনো কিছু না বলে লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জিকেএস