দাম বাড়ায় গরুর খাবার কমাতে বাধ্য হচ্ছেন চাষি

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০২:৫২ পিএম, ১৮ মে ২০২২

অডিও শুনুন

‘যেভাবে গো-খাদ্যের দাম বাড়ছে তাতে আর গরু পালন করা সম্ভব হবে না হয়ত। খামারের গরুগুলোকে এক মাস আগে যে খাবার দিয়েছি এখন তার অর্ধেক পরিমাণে দিচ্ছি। এতে গরু কাহিল হলেও আমার আর কিছুই করার নেই।’ কথাগুলো আক্ষেপ করে বলছিলেন পাবনার ফরিদুপর উপজেলার রতনপুর গ্রামের খামারি হযরত আলী।

তিনি বলেন, ১৫ দিন আগে ৩৫ কেজি ওজনের গমের ছালের দাম ছিল এক হাজার ১১শ’ টাকা সে ছালের দাম হয়েছে ১৯শ’ টাকা।

গো-খাদ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলায় তার মতো উদ্বিগ্ন বহু খামারি বা ছোট কৃষক পরিবার। গরু-মহিষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে পানিতে ভাসমান কচুরিপানার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন অনেকেই। তারা আসন্ন বাজেটে গো-খাদ্যের দাম কম রাখতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

jagonews24

বাজারে ঘুরে জানা গেছে, গমের ছাল প্রতি বস্তা (৩৫ কেজি) ১৯০০ টাকা। সরিষার খৈল প্রতি কেজি ৫৫, ছোলার ভুসি ৫৫,খেসারি ৫৬- ৫৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সব গো-খাদ্যের দাম প্রতি মণে অন্তত দু’শ টাকা বেড়েছে।

চাষিরা জানান, ছয়মাস আগে একবস্তা ভালোমানের গমের ছাল বিক্রি হয়েছে ১২০০-১২৫০ টাকায়। যা এক বছর আগে ছিল ৯৫০-১০০০ টাকা। একইভাবে ছয় মাস আগে মাসকলাইয়ের ভুসির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১৪০০-১৪৫০ টাকায়। এক বছর আগে ছিল ১১০০-১২০০ টাকা। এক বছর আগে এক বস্তা খৈল বিক্রি হয়েছে ২৫০০-২৬০০ টাকায়। এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৩৩শ’-৩৪শ’ টাকা। ছয়মাস আগে ডালের ভুসির বস্তা (৩৫ কেজি) ছিল ১২শ’ টাকা, অ্যাংকর ডালের ভুসি ৮শ’ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে। এরপরও ধীরে ধীরে গো-খাদ্যের দাম বাড়ছিল। কিন্তু গত ১৫ দিনে দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে।

খামারি হযরত আলী জানান, খামারের পাশাপাশি গো-খাদ্যের ব্যবসা করি। মিল মালিকদের কাছ থেকে যে দরে খাবার কিনে আনি সে দর চাইতেই ভয় বা লজ্জা লাগে।

তিনি জানান, ছোট চাষিরা গো-খাদ্য কিনতেই পারছেন না। অনেক গো-খাদ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মতো অনেকেই গরুকে ঠিকমতো খাবার দিতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে কচুরিপানা অথবা খুদের (ভাঙা চাল) ভাত খাওয়াচ্ছেন।

হযরত আলী জানান, ধানের খড়ের দামও বেশি। ছয়শ টাকা মণ দরে খড় কিনতে হচ্ছে। খড়ের মণ হয় ৩০ কেজিতে। প্রতি শতাংশ জমির জাম্বু ঘাস কিনতে হচ্ছে ৩০০ টাকা দরে, প্রতি শতাংশ জমির নেপিয়ার ঘাস ৪০০শ’ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। গো-খাদ্যের দাম কমানো না হলে কিংবা খামারিদের ভর্তুকি মূল্যে গো-খাদ্য না দিলে  খামার রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে বলে জানান।

jagonews24

ফরিদপুর উপজেলার পুঙ্গলী ইউনিয়নের ডেমরা গ্রামের মোহর আলী, রতনপুর গ্রামের চাষি হাবিবুর, বাকী বিল্লাহ, আ. হাই, আনছার আলী, আ. কাদের জানান, দুধের খামার করা তাদের পৈত্রিক পেশা। তাদের একেকজনের ৫-১০টি করে গাভী রয়েছে। কিন্তু তারা তাদের পৈত্রিক পেশাটি ধরে রাখতে হিমহিম খাচ্ছেন। কারণ গো খাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দুগ্ধ উৎপাদন প্রধান এলাকা রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা আলহাজ্ব আলী (৫৫) বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকে গাভী লালন পালনের সঙ্গে জড়িত। বড় হওয়ার পর নিজে খামার করেন। গ্রামের মধ্যে তার খামার বেশ বড় ছিল। যেখানে ৩০টি দুধের গাভী ছিল। কিন্তু তার খামারের অর্ধেকের বেশি গাভী বেচে দিয়েছেন। কারণ গো-খাদ্যের দাম বেশি।

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের (মিল্কভিটা) সাবেক সভাপতি হাসিব খাঁন তরুণ জানান, বৃহত্তর পাবনা জেলায় সমিতিভুক্ত মোট সদস্যের সংখ্যা ৫০ হাজার। তারা গাভী পালন করেন। গো খাদ্যের দাম বাড়ায় তারাসহ অন্য খামারি ও চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুর এলাকায় সরকারি ২৭ কোটি টাকা সরকারি অর্থ সহায়তা ও মিল্কভিটার অর্থায়নে একটি গো-খাদ্য প্লান্ট করা হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের সমবায়ী গো-খামারিরা ন্যায্য মূল্যে সুষম গো-খাদ্য কিনে সার্বিকভাবে লাভবান হচ্ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো গত কয়েক মাস ধরে সেখানে কোনো গোখাদ্য উৎপাদন হচ্ছে না।

অনেক খামারি বলছেন, এখন একটু নিচুমানের বা মোটা চালের চেয়ে ভুসি ও খৈলের দাম বেশি। তাই খরচ বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে গরুকে ভাত খাওয়াতে হচ্ছে। এরকম গো-খাদ্যের দাম বাড়তে থাকলে বাধ্য হয়ে গরু বিক্রি করে দিতে হবে।

jagonews24

গো-খাদ্যের সংকটের কারণে স্থানীয় খড় ব্যবসায়ীরা বোরো ধানের খড় রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ দেশের উঁচু এলাকার জেলাগুলো থেকে কিনে সড়ক ও নৌ পথে এনে খড়ের আড়তদার, কৃষক ও খামারিদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতি মণ বোরো ধানের খড় প্রায় ৬শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

অপরদিকে ভাটি এলাকার মহাজনরা এই এলাকা থেকে উচ্চ দামে গো-খাদ্য কিনে ভাটি এলাকায় নিয়ে গিয়ে আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খামার ও গবাদি পশুর মালিকরা।

এ ব্যাপারে খড় বিক্রেতারা জানান, নিচু এলাকা চলনবিলাঞ্চলে ব্যাপকভাবে বোনা আমন ধানের চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু বোনা আমন ধানের খড় পশু তেমন না খাওয়ায় পশু পালনে এ এলাকার মানুষকে বোরো ধানের খড়ের উপর নির্ভর করতে হয়। যশোর, নওগাঁ, মাগুরা, ঝিনাইদহসহ দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে ট্রাকযোগে রোপা আমন ধানের খড় চলনবিলাঞ্চলে এনে বিক্রি করেন ব্যবসায়িরা। ট্রাক ভাড়া বেশি হওয়ায় খড়ের দামও বেশি পড়ে। বর্তমানে প্রতি ছোট একশ আটি খড় বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩শ টাকায়।

গো-খাদ্যের বিকল্প হিসেবে অনেকে কচুরিপানা, বিভিন্ন গাছের পাতাসহ নানা অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গবাদিপশুকে খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে গবাদি পশু বিক্রিও করে দিচ্ছেন।

jagonews24

দুধ উৎপাদনকারী প্রধান এলাকা বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া জগন্নাথপুর, শম্ভুপুর, সাঁথিয়ার সেলন্দা, নাগডেমরা, সোনাতলা, ধুলাউড়ি, ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা, পারফরিদপুর, সোনাকান্দো প্রভৃতি এলাকার দুধ উৎপাদনকারীরা জানান, গো- খাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে। ফলে বেশ কিছুদিন ধরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত ও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে খৈল, ভুসিসহ বিভিন্ন প্রকার গোখাদ্যের দোকানে তাদের মোটা অংকের টাকা বাকি পড়েছে।

চাটমোহর উপজেলার মির্জাপুর বাজারের গো-খাদ্য বিক্রেতা মো. আব্দুর রহমান বলেন, গতবারের তুলনায় এ বছর গো-খাদ্যের দাম অনেক বেশি বেড়েছে। দাম বেশি হলে আমাদের করার কিছুই নেই। আমরা বেশি মূল্য দিয়ে কিনে আনছি, তাই সীমিত লাভ রেখে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবে দাম কমলে খামারিদের পক্ষে সুবিধা হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাবনা জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আল- মামুন হোসেন জানান, পাবনায় কাচা ঘাসের প্রাচুর্য রয়েছে। এজন্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে না। চাষিদের দানাদার খাদ্যের চেয়ে এখন কাঁচা ঘাস খাওয়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

তবে তিনি জানান, কচুরিপানা গবাদি পশুর আদর্শ খাবার নয়। গবাদি পশুর খাদ্য সংকটের কারণে অনেকে কচুরিপানা খাওয়ান। তবে গবাদি পশুকে মাত্রাতিরিক্ত কচুরিপানা খাওয়ালে পাতলা পায়খানা বা বদ হজম হতে পারে। দুধের ফ্যাট কমে যাবে। গরু বা মহিষ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এফএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]