‘গরু নিয়ে খুব কষ্টে আছি, খাবার দিতে পারছি না’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি জয়পুরহাট
প্রকাশিত: ০৬:১২ পিএম, ২৩ মে ২০২২

জয়পুরহাটে দফায় দফায় বাড়ছে গো-খাদ্যের দাম। ফলে জেলার হাজার হাজার খামারি তাদের গবাদিপশু নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। খাবারের দাম বাড়ায় পশুকে পর্যাপ্ত খাবার দিতে পারছেন না অনেকে। কেউ কেউ আবার গরু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া গো-খাদ্যের বাজারের ঊর্ধ্বগতির কারণে দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামারিরাও লোকসানে পড়েছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, জয়পুরহাটের পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার খামারি রয়েছেন।

এসব খামারির গরুকে খড় ও ঘাসের পাশাপাশি গমের ভুসি, খেসারির ভুসি, বুটের ভুসি, বুটের খোসাসহ বিভিন্ন ধরনের দানাদার খাদ্য খাওয়ানো হয়। কিন্তু গত ১৫ দিনের ব্যবধানে সব গো-খাদ্যের দাম কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এবং বস্তাপ্রতি বেড়েছে ১৫০-৩০০ টাকা।

jagonews24

গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুধ উৎপাদন ও পশু মোটাতাজাকরণে ব্যয় বেড়েছে কৃষক ও খামারিদের। এতে গবাদি পশুপালনে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

জয়পুরহাটের বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৫ দিন আগেও গম, খেসারি ও বুটের ভুসির কেজি ছিল ৪০ টাকা। তা বেড়ে গমের ভুসি প্রতি কেজি ৫৫ টাকা, খেসারির ভুসি ৬০ টাকা, বুটের ভুসি ৬০ টাকা হয়েছে। এছাড়া খৈল, মাসকলাইয়ের ভুসি, মসুরের ভুসি, ভুট্টার আটা, গমের আটা, সয়াবিনের খৈল, খুদ, চিটা গুড়, ক্যাটল ফিডসহ সব গো-খাদ্যের দাম বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫-১০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। একশো আঁটি খড় ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫০ টাকা হয়েছে।

পাঁচবিবির বাগজানা এলাকার আমিনুর রহমান জানান, তার খামারে ১০টি গাভী আছে। প্রতিদিন তার এক বস্তা করে গমের ভুসি ও এক বস্তা বুটের খোসা লাগে। কিন্তু হঠাৎ করে ভুসি ও বুটের খোসার দাম বাড়ায় তিনি বিপাকে পড়েছেন।

তিনি বলেন, গরু নিয়ে খুব কষ্টে আছি। ভুসির দাম বাড়ায় গাভীগুলোকে খাবার দিতে পারছি না। এজন্য গরুর স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে, দুধও কম হচ্ছে। খড়, খৈল, ভুসি ও খুদের যে দাম, তাতে ৫০ টাকা কেজি দুধ বিক্রি করে পোষাচ্ছে না।

jagonews24

পাঁচবিবি উপজেলার ফিচকাঘাট এলাকার ছোট খামারি আহসান হাবীব বলেন, তার তিনটি গরু ছিল। কোরবানির আগে বিক্রির জন্য সেগুলোকে মোটাতাজা করছিলেন। কিন্তু গো-খাদ্যের দাম বাড়ার কারণে সবকয়টি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে সদর উপজেলার তেঘর গ্রামের জুয়েল রহমান শাওন, জয়পুরহাট পৌর এলাকার শান্তিনগর মহল্লার মবিদুল ইসলাম, কালাই উপজেলার মোলামগাড়ী গ্রামের রাজীব হোসেনসহ একাধিক খামারি জানান, খৈল, ভুসি, খুদসহ গরুর সব খাবারের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; তাতে গরু লালনপালন করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাম বেশি হওয়ায় দানাদার খাদ্য দিতে না পেরে ঘাস ও খড় বেশি করে খাওয়ানো হচ্ছে। চালের চেয়ে গো-খাদ্যের দাম বর্তমানে বেশি। এজন্য সরকারকে এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ করছি।

পৌর শহরের ধানমন্ডি এলাকার পাইকারি গো-খাদ্য বিক্রেতা শাহানুর আলম ছোটন বলেন, আমাদের তো কিছু করার নেই। বেশি দামে গো-খাদ্য কিনে আনতে হয়। তাই বেশি দামে বেচতে হয়। আগের চেয়ে বেচাবিক্রি অনেক কমে গেছে।

jagonews24

তিনি বলেন, বিদেশি কাঁচামালের কারণে গো-খাদ্যের দাম বাড়ছে বলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জানাচ্ছে।

জয়পুরহাট ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাদমান আলিফ মিম রায়হান বলেন, আমার খামারে গরু মোটাতাজাকরণ করা হয় প্রাকৃতিক উপায়ে। খামারে গরুর খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয় চালের খুদ, ভুসি, খেসারি-মসুর ডাল, খড় ও চোকর (গমের খোসা)। গরু প্রতি দিনে খাবারের জন্য খরচ হয় ১০০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। এক লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য গাভীকে ৭১ টাকা খরচ করে খাওয়াতে হয়। বাজারে দুধের চাহিদা না থাকায় বর্তমানে প্রতি লিটার দুধ সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। এতে আমাদের প্রত্যেক দিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।

গো-খাদ্যের দাম মনিটরিং করাসহ খাদ্যের ওপর ভর্তুকি দিয়ে এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

জয়পুরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহফুজার রহমান বলেন, কৃষক ও খামারিদের আধুনিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণসহ সব ধরনের সেবা ও পরামর্শ আমরা দিচ্ছি। গো-খাদ্যের দাম বাড়লে সাধারণ কৃষক ও খামারিদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। বিদেশি কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে গো-খাদ্যের দামের ওপর প্রভাব পড়ছে বলে তিনি মনে করেন।

রাশেদুজ্জামান/এমআরআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]