কলেজছাত্রী হামিদার খামারে ৪৫ মণের ষাঁড়, দাম ১৫ লাখ
টাঙ্গাইল সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন হামিদা আক্তার। তবে পড়ালেখা শেষে চাকরি নয়, বড় খামারি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। পাঁচ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের গাভিসহ ষাঁড় গরু লালনপালন করছেন।
বর্তমানে হামিদা আক্তারের খামারে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের তিনটি গরু। দেশীয় পদ্ধতিতে লালনপালন করে এরই মধ্যে বড় করে তুলেছেন পাঁচ বছর বয়সী বিশালাকৃতির একটি ষাঁড়। নাম দিয়েছেন ‘মানিক’।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ষাঁড়টি প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৮০০ কেজি (৪৫ মণ) ওজনের ষাঁড়টির দাঁম হাকাচ্ছেন ১৫ লাখ টাকা। জেলার সবচেয়ে বড় এই ষাঁড়টি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন মানুষ আসছে হামিদার বাড়িতে।
হামিদা আক্তার টাঙ্গাইলের নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলার সীমান্তবর্তী লাউহাটি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভেঙ্গুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ ও রিনা বেগমের মেয়ে।

হামিদ-রিনা দম্পতির তিন মেয়ের মধ্যে সবার বড় হামিদা। উপার্জনের টাকায় নিজের ও দুই বোনের লেখাপড়ার ব্যয় বহনসহ কৃষক বাবার সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। এরই মধ্যে ছোট দুই বোনকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাসও করিয়েছেন। এক বোনের বিয়ে দেওয়াসহ আরেক বোনকে লেখাপড়া করাচ্ছেন নার্সিংয়ে।
ভিটেবাড়িসহ বাবার জমি পরিমাণ মাত্র ৫০ শতাংশ। বাবার পক্ষে সংসারের এত খরচ বহন অসম্ভব হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি দর্জির কাজ শুরু করেন হামিদা আক্তার। এরপর থেকে পাঁচ বছর ধরে গরু, রাজহাঁস ও কবুতর লালনপালনসহ বিকাশ এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তার ব্যবসার ঠিকানা হিসেবে এক বছর হলো বাড়ির সামনে বসিয়েছেন একটি মুদি দোকান। সেই দোকানেই নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী বিক্রির পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন বিকাশ এজেন্ট, ফ্লেক্সিলোড আর দর্জির কাজ।
হামিদা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, পরিবারের সদস্যের মতোই বড় হচ্ছে তার অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের গরুগুলো। তাদের থাকার ঘরে রয়েছে দুটি সিলিং ফ্যান আর মশারি। নিয়মিত খাবারের তালিকায় রয়েছে খড়, ভুসি, কাঁচাঘাস, মাল্টা, পেয়ারা, কলা, মিষ্টি কুমড়া ও মিষ্টি আলু। রোগ জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন তাদের সাবান আর শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয়।
পাঁচ বছর আগে হামিদার খামারেই জন্ম নেয় মানিক ও রতন নামের ষাঁড় দুটি। গত কোরবানির হাটেই তাদের বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। গতবছরই মানিকের ওজন ছিল ৩৫ মণ আর রতনের ৩৪ মণ। দাম চেয়েছিলেন মানিকের জন্য ১৪ লাখ আর রতনের ১৩ লাখ। গরুর ব্যবসায়ীরা বাড়িতে এসে মানিকের দাম বলেছিলেন ৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাকিতে নেওয়ার কথা বলায় মানিককে আর বিক্রি করা হয়নি।
পরে ঢাকার গাবতলী হাটে নেওয়া হয় মানিক ও রতনকে। তবে করোনার কারণে হাটে নিয়েও সুবিধা হয়নি। মাত্র চার লাখ টাকায় রতনকে বিক্রি করা হলেও মানিককে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন হামিদা।

মানিকের দৈনিক খাবার লাগে ১৭ কেজি গমের ভুসি, ৪ কেজি ছোলা, ২ কেজি খুদের ভাত, আধাকেজি সরিষার খৈল। পাশাপাশি দৈনিক তাকে খাওয়ানো হয় নানা জাতের পাকা কলা। বর্তমানে মানিকের ওজন ৪৫ মণ বলে দাবি করছেন হামিদা।
হামিদা আক্তার বলেন, ‘বাড়ি থেকেই ষাঁড়টি বিক্রির চেষ্টা করছি। বাড়িতে এসে যদি কোনো ক্রেতা ন্যায্য দাম বলেন, তাহলে আমরা নিজ খরচে মানিককে ক্রেতাদের বাড়িতে পৌঁছে দেবো। আসা করছি এ বছর ভালো দামে মানিককে বিক্রি করতে পারবো।’
লেখাপড়া করেও গরু লালনপালন করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি পড়ালেখা করছি চাকরি করার জন্য নয়। আমার স্বপ্ন আমি একজন বড় গরুর খামারি হব। এ বছর যদি ভালো দামে মানিককে বিক্রি করতে পারি, তবে সেই টাকায় আমার স্বপ্নের খামারটি নির্মাণ করবো। ওই খামারে লালনপালন করবো ভালো জাতের সব গরু।’
হামিদার মা রিনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার মেয়েদের জন্মের আগে থেকেই ওর বাবা গরু লালনপালন করতেন। যা দেখে হামিদাও গরু লালনপালনে আগ্রহী হয়েছে।’

দেলদুয়ার উপজেলা কেদারপুর থেকে ষাঁড়টি দেখতে আসা সোহেল রানা বলেন, ‘এত বড় ষাঁড়ের কথা শুনেই এখানে এসেছি। আমার ধারণ, জেলার সবচেয়ে বড় ষাঁড় এটিই।’
লাউহাটি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম বুদ্দু বলেন, ‘হামিদার ছোট খামারে এবার ৪৫ মণের একটি ষাঁড় গরু হয়েছে। আমি চাই দরিদ্র পরিবারের মেয়েটির ষাঁড়টি ভালো দামে বিক্রি হোক।’
লাউহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহীন মোহাম্মদ খান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী হামিদার গরু লালনপালনের বিষয়টি আমি জানি। তবে কখনো সাহায্য- সহযোগিতার জন্য আমার কাছে আসেননি। যদি তিনি কখনো বড় ধরনের খামার করতে আমাদের সহযোগিতা চান তাহলে অবশ্যই করবো।’
এ বিষয়ে দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী বলেন, এ উপজেলায় হামিদার ষাঁড়টিই সবচেয়ে বড়। আমাদের অনলাইন হাটে তার ষাঁড়টির ছবি, ওজন ও দাম উল্লেখ করে বিক্রির জন্য প্রচারণা চালানো হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/এসআর/জেআইএম