এবারও বিক্রি হলো না হামিদার ‘মানিক’
এবারও বিক্রি হয়নি কলেজছাত্রী হামিদার খামারে বেড়ে উঠা ৪৫ মণ ওজনের ‘মানিক’। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত ঢাকার গাবতলী হাটে অপেক্ষার পরও বিশাল আকৃতির ষাঁড়টি দেখে আকৃষ্ট হয়নি ক্রেতারা। এ নিয়ে তিন দফায় হাটে উঠলেও বিক্রি হলো না ‘মানিক’ নামের ষাঁড়টি।
এরপরও হতাশ নন হামিদা। স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবার বিশাল আকৃতির ষাঁড় মানিককে নিয়ে ছোট পরিসরে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের দুগ্ধ খামার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
টাঙ্গাইল সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইতিহাসে অনার্স পাশ করা হামিদা আক্তার জেলার নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলার সীমান্তবর্তী লাউহাটি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভেঙ্গুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ ও রিনা বেগমের মেয়ে।
আক্ষেপ করে হামিদা বলেন, বড়লোকদের সঙ্গে খামারিদের সম্পর্ক। ঈদের আগে খামারিদের গরু বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের মত স্বপ্ন দেখা গরীব মানুষের জন্য ধনীরা নন।
তিনি আরও জানান, দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গাজীপুরের এক ব্যবসায়ীর ফোন নম্বর দেন। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে তিনি না দেখেই ষাঁড়টির দাম বলেন তিন লাখ টাকা বলেন। গত বছর করোনায় রাজধানীর গাবতলী হাটে মানিকের দাম উঠেছিল পাঁচ লাখ টাকা। তার আগের বছর মানিককে নেওয়া হয় পুরান ঢাকার ঢলপুর বাজারে। সেখানে মানিকের ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
মানিককে বিক্রির জন্য বাড়িতেই অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের পরামর্শে বাধ্য হয়ে ৭ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে মানিক আর সাড়ে সাত মণ ওজনের আরও একটি ষাঁড়টি নিয়ে যাই গাবতলী হাটে। ষাঁড় দুটি দেখভালের জন্য আমার এক মামাসহ তিনজন কামলা রয়েছেন। দিনে জনপ্রতি ৭০০ টাকা করে দেওয়া হয় তাদের।
হামিদা বলেন, হাটের জায়গা ভাড়া নেওয়া এক ব্যবসায়ীর সব গরু বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তিনি আমাকে গরু দুটি রাখার ব্যবস্থা করে দেন। এরপরও গাবতলী হাটের লোকজন এসে জায়গার টাকা দাবি করেন। ওই ব্যবসায়ী নিজের গরু বলে প্রতিবাদ করার পরও দুই গরু বাবদ দুই হাজার টাকা নিয়েছেন ইজারাদাররা।

হামিদা বলেন, হাটে উঠানোর চারদিনেও বড় গরু কেনার ক্রেতা পাইনি। কেউ মানিকের দামও করেননি। তবে সাত থেকে সাড়ে সাত মণ ওজনের যে ষাঁড়টি ছিল সেটি এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঈদের দিন সকালে মানিককে নিয়ে বাড়ি চলে আসি।
খরচ প্রসঙ্গে হামিদা বলেন, হাটে যাতায়াত বাবদ গাড়ি ভাড়া ১০ হাজার, ইজারা বাবদ দুই হাজার, চারদিনের কামলা বেতন দুই হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। খাওয়ায় কত টাকা খরচ হয়েছে তার হিসেব করি নাই। এছাড়াও আমার মামা কোনো টাকা নেননি।
তিনি বলেন, গরুর বড় খামারি হতে না পারলেও এবার একটি দুগ্ধ খামার করবো। গাবতলী হাটে এবার বিক্রি করা ছোট ষাঁড়ের এক লাখ ৭০ হাজার টাকাসহ আমার বিকাশ এজেন্ট, দর্জির কাজ আর ব্যবসার জমানো টাকা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান কয়েকটি গাভীর বাচ্চা কিনবো। সেই বাচ্চাগুলো লালন পালন করে বড় করবো। এ জাতের গাভী অনেক দুধ দেয়। আমার সেই খামারে গাভীগুলোর সঙ্গে মানিকও থাকবে।
হামিদা বলেন, অন্যের সাহায্য ছাড়াই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছে আমার। পড়ালেখা করেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো না এটা মানতে আমি রাজি নই। আমি চাই আমাকে দেখে যেন সমাজের প্রতিটি মেয়েই নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বুদ্দু বলেন, হামিদার ৪৫ মণের ষাঁড়টি বিক্রি হয়নি শুনে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।
লাউহাটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহীন মোহাম্মদ খান বলেন, হামিদার ষাঁড়টি এবারও বিক্রি হয়নি বলে শুনেছি। এতে হতাশ হয়েছি। দোয়া করি তার বড় খামারি হওয়ার স্বপ্নটা যেন পূরণ হয়।
এ বিষয়ে দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী জানান, করোনা পর থেকেই দেশে বড় গরুর চাহিদা কমে গেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি হাটেই এবার চাহিদা ছিল মাঝারি আর ছোট গরুর। বেশিরভাগ বড় গরুই এবার অবিক্রীত থেকে গেছে। এ কারণেই কলেজছাত্রী হামিদার গরুটি বিক্রি হয়নি।
তিনি জানান, পাবনা ব্যাঙ্গ মিট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান মাংসের ওজনে গরু কেনেন। হামিদা চাইলে, সেখানে ষাঁড়টি বিক্রির ব্যবস্থা করে দিবেন। এতে আশানুরূপ দাম না পেলেও ষাঁড়টি বিক্রি করা সম্ভব হবে।
আরিফ উর রহমান টগর/আরএইচ/এএসএম