আওয়ামী লীগের কর্মী নিয়ে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ১০:০২ পিএম, ১৩ আগস্ট ২০২২

সম্প্রতি বরগুনার বেতাগী উপজেলায় ১১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দিয়েছে জেলা বিএনপি। তবে উপজেলার সে আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়কসহ ১১ জনের পাঁচজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। বছরজুড়েই তাদের দেখা মিলেছে আওয়ামী লীগের নানা কর্মকাণ্ডে। হঠাৎ করেই তাদের আহ্বায়ক কমিটিতে চলে আসা নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে উপজেলা বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

জেলা কমিটির আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম ও সদস্য সচিব তারিকুজ্জামান টিটু গত ২ আগস্ট জেলা বিএনপির প্যাডে মো. হুমায়ুন কবির মল্লিককে আহ্বায়ক ও মো. গোলাম সরোয়ার রিয়াদকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের সেই কমিটির অনুমোদন করেন।

আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. শাহীন গত ইউনিয়ন নির্বাচনে উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মো. খলিলুর রহমানের হয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। জাগো নিউজের হাতে আসা এক ছবিতে দেখা যায়, নৌকার প্রচারসভায় সামনের সারিতে বসেই আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।

কমিটি তালিকার তিন নম্বরে থাকা যুগ্ম-আহ্বায়ক প্রভাষক মাহবুব আলম সুজন মল্লিকও গত কয়েক বছর ধরে কাজ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে। জাগো নিউজের হাতে আসা আরেক ছবিতে সুজন মল্লিককে দেখা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বরগুনা ২ আসনের সংসদ সদ্য শওকত হাচানুর রহমান রিমোনের সঙ্গে। সেখানে আওয়ামী লীগের এক আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে বসেছিলেন তিনি। পেছনে থাকা ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর ছবি আর লেখা যা প্রমাণ করে।

কমিটির ৪ নম্বরে থাকা আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান সোহাগও বিগত দিনে কাজ করেছেন আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে। জাগো নিউজের হাতে আসা আরেক ছবি যার প্রমাণ। ছবিতে দেখা যায়, হাফিজুর রহমান সোহাগ নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর লিফলেট নিয়ে ভোট চাইছেন।

তালিকার ৬ নম্বরে আছেন আ. সালাম সিদ্দিকী। ওই কমিটির তিনিও একজন যুগ্ম-আহ্বায়ক হলেও বিগত দিনে তাকে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের নানা কর্মসূচিতে। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা যাচ্ছে নেতৃত্ব দিতে।

আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব গোলাম ছরোয়ার রিয়াদ খানও একই অভিযোগে অভিযুক্ত। আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে কাজ করেছেন তিনি। বিভিন্ন দিবসে বেতাগী উপজেলাজুড়ে যে শুভেচ্ছা ব্যানার তিনি লাগিয়েছেন তাতে বিএনপি নয় আওয়ামী লীগের নেতাদের ছবিই দেখা গেছে তার ব্যানারে। উপজেলার অলিগলিতে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানানো তার ব্যানারে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি। এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম কবির এবং বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শওকত হাচানুর রহমানের ছবি।

বিতর্কের বিষয়টি নিয়ে বেতাগী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির কয়েকজনের সঙ্গে জাগো নিউজের কথা হয়। যুগ্ম-আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. শাহীন জানান, বেতাগী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক তিনি। কলেজটির সাবেক সভাপতি মো. খলিলুর রহমান ছিলেন হোসনাবাদ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী। তার কলেজে চাকরি করায় বাধ্য হয়েই তখন নৌকার নির্বাচনী সভায় বসেছিলেন তিনি। তবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই জড়িত ছিলেন এবং আছেন।

একইভাবে কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক আ. সালাম সিদ্দিকীও জানান, বেতাগীর একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করতে গিয়ে সরকারি সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে তাকে। তখন অনেক অনুষ্ঠানেই ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছিল। ছিল আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানও। মন থেকে বিএনপি করলেও বাধ্য হয়েই তখন সেসব অনুষ্ঠান করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেতাগী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শাহজাহান কবির জাগো নিউজকে বলেন, বিতর্কিত এই ব্যক্তিরা এক সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে এরা সুবিধাবাদী হওয়ায় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে মিশে সুবিধা নিয়েছেন। বর্তমানে আবার নতুন কমিটি গঠনের আভাস পেয়ে রাতের আঁধারে জেলার আহ্বায়ক কমিটিকে ম্যানেজ করে বিএনপিতে ঢুকে পড়েছেন।

জেলার আহ্বায়ক কমিটির এমন কর্মকাণ্ডে উপজেলার বিএনপি নেতারা হতাশ হয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, এ ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সব নেতাকর্মীরা এক হয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেবেন।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষ থেকে কথা হয় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুবুল আলমের সঙ্গে। তার দাবি, আগামী নির্বাচনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে বিএনপি। তাই সবাই দলের পদ-পদবি চান। আর সে কারণেই উপজেলাগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্ক শুরু হচ্ছে।

তিনি বলেন, যাদের আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়েছে তারাই মূলত দলের জন্য বিগতদিনে কাজ করেছেন। টানা ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তাদের নানা কারণে এক টেবিলে বসতে বাধ্য হতে হয়েছে। আর এক টেবিলে বসা মানেই সেই দলে যুক্ত হওয়া নয়। যারা ত্যাগী তাদেরই আহ্বায়ক কমিটিতে মূল্যায়ন করেছেন তিনি।

এম এ আজীম/এমআরআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।