নওগাঁয় আউশ ধানের মণ ৮০০ টাকা, হতাশ চাষিরা
আউশ ধান কাটা-মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন নওগাঁর চাষিরা। তবে ধানের ফলন ভালো হলেও দাম কমে যাওয়ায় তাদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাজ। এতে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
চাষিরা বলছেন- অনাবৃষ্টির কারণে এবার আউশ আবাদে বেশি সেচ দিতে হয়েছে। এছাড়া পোকার আক্রমণে কীটনাশক বেশি প্রয়োগ করতে হয়েছে। এবছর সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে বাজারে মাত্র ৮০০-৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে ধান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধান আবাদ হয়েছে। কৃষকরা সবচেয়ে বেশ চাষ করেছেন ব্রি-৪৮ জাতের ধান। অন্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রি-২৮, ৫৬, ৬৫, ৮২, ৮৫, বিআর-২১, বিনা-১৯, পারিজা এবং জিরাশাইল।
উপজেলাভিত্তিক চাষ করা জমির পরিমাণ হচ্ছে- নওগাঁ সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর, রানীনগরে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর, আত্রাইয়ে ১ হাজার ৭২০ হেক্টর, বদলগাছীতে ১ হাজার ৫৬০ হেক্টর, মহাদেবপুরে ১৩ হাজার ১১০ হেক্টর, পত্নীতলায় ৬ হাজার ৮৫০ হেক্টর, ধামইরহাটে ২ হাজার ২৮০ হেক্টর এবং মান্দা উপজেলায় ১৪ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ করা হয়েছে।

এছাড়া বরেন্দ্র এলাকা সাপাহার উপজেলায় ৭৯৫ হেক্টর, পোরশায় ৯১০ হেক্টর এবং নিয়ামতপুরে ৯ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ করা হয়েছে।
এই জমি থেকে ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০ মেট্রিক টন। সেখানে চালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন। এরই মধ্যে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা-মাড়াই হয়েছে।
আউশ ধানকে বলা হয় আপদকালীন ফসল। তাই সোনালি এ ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। ধানের ফলনে খুশি হলেও দামে সন্তুষ্ট না তারা। বাজারে ধানের দাম নিম্নমুখী হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
রোববার (৪ সেপ্টেম্বর) মহাদেবপুর উপজেলার চকগৌরি হাটে আউশ বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছিলেন কৃষকরা। এক সপ্তাহে আগে শুকনা ধান বেচাকেনা হয়েছিল ৯০০-৯৩০ টাকা মণ। আর সামান্য ভেজা ধান বিক্রি হয়েছিল ৮৫০-৮৮০ টাকা মণ। এ সপ্তাহে শুকনা ধান বিক্রি হয় ৯১০ টাকা মণ। আর ভেজা ধান বিক্রি হয় ৮০০-৮৫০ টাকা।
চাষিরা বলছেন, গতবছর বিঘাতে ৪-৫ হাজার টাকা খরচে আউশের আবাদ হয়েছিল। এবছর শুরু থেকে অনাবৃষ্টির কারণে বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে। এছাড়া ফসলের পোকার আক্রমণ হওয়ায় কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়েছে। আবার সার, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এতে করে প্রতি বিঘাতে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। যেখানে ফসল উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৬-৭ হাজার টাকা। আবার কাটা মাড়াইয়ে দূরত্ব ভেদে ২৮০০-৪০০০ টাকা শ্রমিক মজুরি দিতে হচ্ছে। তাই প্রতি মণ ধান ১১০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন। অন্যথায় লোকসান গুনতে হবে।

বদলগাছী উপজেলার চাকরাইল গ্রামের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, এবছর তিন বিঘা জমিতে আউশ ধানের আবাদ করেছি। গত বছর আবাদ করতে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। এবছর শুরু থেকে অনাবৃষ্টির কারণে জমিতে সেচ বেশি দিতে হয়েছে। সার, তেল ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় বিঘাপ্রতি আরও প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এতে আবাদ করতে বিঘাপ্রতি প্রায় ৬-৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর বিঘাপ্রতি ফলন হচ্ছে ১৫-২১ মণ। তবে বাজারে ধানের দাম বেশ কম।
একই গ্রামে কৃষক শাহাদত হোসেন বলেন, গত ইরি-বোরো ধানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিঘাপ্রতি ১৫-১৮ মণ ফলন পাওয়া গেছে। আবার শ্রমিক দিয়ে কেটে নিতে ধানের অর্ধেক বা ৭-৮ হাজার টাকা বিঘা হিসেবে দিতে হয়েছে। তবে আউশের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে ধানের দাম যদি ১১০০-১৫০০ টাকা পাওয়া যায় তাহলে লাভবান হওয়া যাবে। তা না হলে লোকসান গুনতে হবে।
মহাদেবপুর উপজেলার বাগাচারা গ্রামের কৃষক মতিউর রহমান বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে ধান লাগানো হয়েছে। পোকার আক্রমণ হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হবে। তারপরও বিঘাপ্রতি ১৫ মণের মতো আশা করা হচ্ছে। বিঘাপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা মজুরি দিয়ে ধান কেটে নিতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও ধানে দাম ১০০০ টাকা মণ ছিল। এখন ৮০০-৯০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। এতে লোকসান গুনতে হবে।
চকগৌরি গ্রামের কৃষক সবুজ কুমার বলেন, হাটে ১০ মণ ভেজা ধান নিয়ে এসে বিক্রি করেছি ৮০০ টাকা মণ। ধান কাটার পর বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। শুকানোর মতো জায়গা না থাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। ধান রেখে দিলে চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকদের লোকসানে পড়তে হবে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আবু হোসেন বলেন, এবছর ৬১ হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৫৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। পোকার আক্রমণ হলেও গুরুতর বা আশঙ্কাজনক ছিল না। তারপরও ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরা আশানুরূপ ফলন পাবে। এরইমধ্যে ৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। ফলনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আশা করছি।
আব্বাস আলী/এমআরআর/এমএস