হাসপাতালে নেই অ্যান্টিভেনম, ঝাড়ফুঁকে ঝুঁকছেন সাপে কাটা রোগীরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নড়াইল
প্রকাশিত: ০৭:৩৬ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

নড়াইল সদরের আউড়িয়া ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের বাসিন্দা কুরবান আলী। গত ১৫ আগস্ট তার ছেলে আশিক (১৪) রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে সাপে কামড় দেয়। রাত ১১টার দিকে নড়াইল সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে প্রথমে স্যালাইন ও পরে ইনজেকশন দেওয়া হয়। এর ১০ মিনিটের মাথায় নিস্তেজ হয়ে পড়লে খুলনা নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে মাইক্রোবাসে করে রওনা দিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আশিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি নড়াইলে সাপের উপদ্রব বেড়েছে। প্রায়ই সর্প দংশনের ঘটনা ঘটছে। গত আড়াই মাসে নড়াইলে এক ডিপ্লোমা প্রকৌশলীসহ তিনজনের মৃত্যু এবং অনেককে সর্প দংশনের খবর পাওয়া গেছে। তবে নড়াইল সদর হাসপাতালে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার ওষুধ অ্যান্টিভেনম না থাকায় রোগীদের নিয়ে ওঝা-কবিরাজের দারস্থ হচ্ছেন স্বজনরা। এতে মারা যাচ্ছেন রোগীরা।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দুই সপ্তাহ নড়াইল সদর হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম নেই। এরআগে গত ২১ জুলাই ২০০ অ্যান্টিভেনম আনা হলেও তার মেয়াদ ছিল ৪০ দিন। ২০১৩ সাল থেকে সদর হাসপাতালে সরকারিভাবে এ প্রতিষেধক দেওয়া হচ্ছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮২০ পিস অ্যান্টিভেনম এসেছে। তবে এসবের একটি ব্যবহার হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের স্টোরকিপার (ভারপ্রাপ্ত) আলফাজ উদ্দিন। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এসব অ্যান্টিভেনম কোনো কাজে আসেনি। সর্বশেষ গত পাঁচ বছরে নড়াইল সদর হাসপাতালে কত পিস অ্যান্টিভেনম এসেছে এবং কতটি ব্যবহার হয়েছে সে তথ্য দিতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আউড়িয়া ইউনিয়নের খলিশাখালী গ্রামের গৃহবধূ হেনা বেগম জানান, গত ৩১ আগস্ট তার প্রকৌশলী (ডিপ্লোমা) ছেলে মামুন রহমানকে বাড়িতে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় সাপে দংশন করে। রাত ২টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

সদর হাসপাতালে নিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে হেনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কেউ বলেছেন নড়াইল সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন নেই। আবার কেউ বলেছেন থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণ। সে কারণে তাকে খুলনায় নিয়েছিলাম।’

আউড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আনোয়ারা বেগমের ভাষ্যমতে, গত এক মাসে কমলাপুর, খলিশাখালীসহ কয়েকটি গ্রামে অন্তত ১০ জনকে সাপে দংশন করেছে। পরিবারের লোকজন রোগীদের হাসপাতালে না নিয়ে গ্রাম্য ওঝাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

নড়াইল পৌরসভার বাহিরডাঙ্গা এলাকার কৃষক দিপক বিশ্বাস জানান, তাদের গ্রামে গত এক মাসে ছয়জনকে বিষধর গোখরা সাপে দংশন করেছে। এদের সবাই ওঝার কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিয়েছেন।

হাসপাতালে নেই অ্যান্টিভেনম, ঝাড়ফুঁকে ঝুঁকছেন সাপে কাটা রোগীরা

নড়াইলে সাপের উপদ্রব বেশি উল্লেখ করে উজিরপুর অর্গানিক বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সায়েদ আলী শান্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইকো সিস্টেমের অংশ হিসেবে সাপ বিল-মাঠে বসবাস করে। এতে ফসলের ওপর ইঁদুরের আক্রমণ কম হয়। তবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দিয়ে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করালে একজনও মরতো না।’

নড়াইল সদর হাসপাতালের স্টোরকিপার (ভারপ্রাপ্ত) আলফাজ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি স্টোরকিপার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর ৫০০ শিশি অ্যান্টিভেনম আসে। এরপর গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডিসি বিভাগ থেকে ২০০ শিশি পাওয়া যায়। যার মেয়াদ ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। স্বল্প মেয়াদের এ অ্যান্টিভেনম আনতে অপারগতা প্রকাশ করলেও না এনে উপায় ছিল না। সদর হাসপাতালের মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে ১০০ শিশি দিয়ে বাকিগুলো স্টোরে রেখে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আরও ১০০ শিশি অ্যান্টিভেনম বরাদ্দ পেলেও হাতে পাইনি। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর সেগুলো দেওয়া হবে।

গত পাঁচ বছরে হাসপাতালে কত শিশি অ্যান্টিভেনম সিরাম এসেছে এবং কত পিস ব্যবহার হয়েছে জানতে চাইলে স্টোরকিপার বলেন, ‘এ তথ্য আমার জানা নেই।’

এ বিষয়ে নড়াইল সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রেমানন্দ মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ১০০ শিশি অ্যান্টিভেনম পাওয়া যাবে। আশা করছি এগুলো আমরা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবো।

তবে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও জেলা সিভিল সার্জন ডা. নাসিমা আক্তারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাফিজুল নিলু/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।