জোড়া খুনের নেপথ্যে শারীরিক সম্পর্ক: ভারতে পালিয়েও হলো না শেষরক্ষা
গাজীপুরের শ্রীপুরে মা-ছেলে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে থানা পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতার যুবক পুলিশের কাছে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
শুক্রবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় শ্রীপুর থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কালিয়াকৈর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন।
এ সময় শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমজাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
কালিয়াকৈর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন জানান, ৭ জানুয়ারি বিকেলে জেলার শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড গ্রামের দাইপাড়া এলাকায় বসতঘর থেকে ২২ বছর বয়সী রুবিনা ও তার ৪ বছর বয়সী ছেলে জিহাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জোড়া খুনের রহস্য ও ঘাতককে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করে সবশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার রহমত উল্ল্যাহ্ (২৯) গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের কুষদী গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। তিনি পরিবার নিয়ে নিহত রুবিনার বাড়ির পাশে ভাড়া থাকতেন। নিহত রুবিনা (২২) শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পশ্চিমখণ্ড গ্রামের সিরাজ মিয়ার মেয়ে ও তার চার বছর বয়সী ছেলে জিহাদ।

সহকারী পুলিশ সুপার আজমীর হোসেন জানান, বাবার দেওয়া জমিতে আধাপাকা বাড়িতে চার বছর বয়সী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন রুবিনা। বনিবনা না হওয়ায় স্বামী ঝুমন পার্শ্ববর্তী মুলাইদ গ্রামের রঙ্গিলা বাজার এলাকায় তার পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। রুবিনার বসতবাড়ির পাশেই পেশায় রংমিস্ত্রী রহমত উল্ল্যাহ্ ভাড়া থাকতেন। রুবিনার আধাপাকা বাড়িটি রং করার জন্য রংমিস্ত্রী রহমত উল্ল্যাহর কাছে যান রুবিনা। সেখান থেকেই তাদের পরিচয় হয় এবং ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠলে বাড়ির বাজারসহ অন্যান্য কাজকর্ম রহমত উল্ল্যাহকে দিয়েই করাতেন রুবিনা।
এক পর্যায়ে রহমত উল্ল্যাহ্ রুবিনাকে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। প্রথমে রাজি না হলেও এক পর্যায়ে রাজি হন এবং রহমত উল্ল্যাহকে রাতে বাড়ি যেতে বলেও রুবিনা গেট খুলতেন না। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর রুবিনা তার ব্যবহৃত মোবাইল থেকে রহমত উল্ল্যাহকে তলপেটে ব্যথার করার কথা জানিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে এনে দেওয়ার জন্য বলেন।
রহমত উল্ল্যাহ পল্লীবিদ্যুৎ মোড়ে গিয়ে দেলোয়ারের ফার্মেসি থেকে ৭ দিনের জন্য ওষধ কিনে এবং নিজে খাওয়ার কথা বলে দুটি ঘুমের ট্যাবলেট কিনে রুবিনার বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসেন। এরপর ৩ জানুয়ারি দুপুর ১টায় রুবিনার বাড়ি গিয়ে তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার জন্য বললে দুপুর আড়াইটায় ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর নিজের বাসায় চলে যান রহমত উল্ল্যাহ।
ওইদিন রাত ৮টায় রহমত উল্ল্যাহ খাবার খেয়ে শারীরিক সম্পর্কের জন্য রুবিনার বাসায় গেলে অর্ধঅচেতন অবস্থায় রুবিনাকে খাটের ওপর শুয়ে থাকতে এবং ছেলে জিহাদকে মোবাইলে গেমস্ খেলা অবস্থায় দেখে জিহাদের ঘুমের অপেক্ষা করতে থাকেন। রাত ১০টায় জিহাদ ঘুমিয়ে পড়লে খাটে শুয়ে থাকা অর্ধঅচেতন রুবিনার শরীরে স্পর্শ করেন রহমত উল্ল্যাহ। এ সময় রুবিনা তাকে বাধা দেন। পরে রুবিনার বুকের ওপর বসে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য ধস্তাধস্তি করতে থাকলে হঠাৎ তাদের হাতটি ঘুমিয়ে থাকা জিহাদের গায়ের ওপর গিয়ে পড়লে সে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে বসে।
জিহাদ যাতে চিৎকার করতে না পারে তাই ডান হাত দিয়ে জিহাদের গলা তার বুকের সঙ্গে চেপে ধরেন এবং বাম হাত দিয়ে রুবিনার গলা চেপে ধরেন যাতে তিনিও চিকৎকার করতে না পারেন। এক পর্যায়ে জিহাদ নিস্তেজ হয়ে গেলে সে মারা গেছে বলে বুঝতে পারেন রহমত উল্ল্যাহ। এ সময় তার চিন্তা হয়, সকালে রুবিনা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে ঘটনাটি সবাইকে বলে দেবেন। সেই ভয়ে রুবিনার বুকের ওপর বসেই তাকে গলাটিপে হত্যা করেন রহমত উল্ল্যাহ।
এ সময় তার ঘরে থাকা দুটি স্মার্টফোন, ভ্যানিটি ব্যাগে থাকা ২ হাজার ৫শ টাকা ও রুবিনার পায়ের নুপুর নিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগিয়ে চলে যান। ৭ জানুয়ারি ঘটনাটি জানাজানি হলে তিনি এলাকার মানুষদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
দু’দিন পর ৯ জানুয়ারি রাত ১২টায় পুলিশ রহমত উল্ল্যাহকে ভাড়াবাসায় খুঁজতে গেলে তিনি দেওয়াল টপকে পালিয়ে নরসিংদীতে ফুপুর বাসায় যান। সেখানে একদিন থাকার পর টঙ্গীতে এক বন্ধুর বাসায় তিন-চারদিন অবস্থান করেন। সেখান থেকে ভগ্নিপতির মাধ্যমে গোপালগঞ্জে দেবাশীষ নামের এক ব্যক্তি বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। দেবাশীষের কাছেই রুবিনার ঘর থেকে নেওয়া দুটি মোবাইল ফোন ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে রহমত উল্ল্যাহ। ওই টাকা নিয়ে এক দালালের মাধ্যমে যশোর সীমান্ত হয়ে ভারতে চলে যান। ভারতের নদিয়া জেলার কৃষ্ণপুর থানা সংলগ্ন পেপসি কোম্পানিতে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে শ্রমিক হিসেবে কাজও পান।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমজাদ হোসেন জানান, মা-ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পর কোনো ধরনের ক্লু খুঁজে পাচ্ছিল না পুলিশ। নিহত রুবিনার স্বামীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তাতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়াও হত্যার রহস্য জানতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় সোর্স নিয়োগ দেওয়া হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে গোপালগঞ্জ থেকে রুবিনার মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে জানা যায় রহমত উল্ল্যাহ দালালের মাধ্যমে ভারতে পালিয়ে গেছেন।
]
তিনি জানান, রহমত উল্ল্যাহ ভারতের নদীয়া জেলার কৃষ্ণপুর থানার পেপসি কোম্পানিতে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ নেন। পরে যশোর সীমান্তে বাংলাদেশের দালালদের মাধ্যমে ভারতের দালালদের সঙ্গে রহমত উল্ল্যাহকে ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ করা হয়। পরে ভারতীয় দালালরা রহমত উল্ল্যাহকে চিহ্নিত করেন এবং তার অবস্থান সম্পর্কে জানালে বাংলাদেশের সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
সবশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩টায় তাকে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে পৌঁছে দেন ভারতের দালালরা। সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি আরও জানান, যেদিন রহমত উল্ল্যাহ শ্রীপুর এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান ওই দিন তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছিল রহমত উল্ল্যাহকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনি তুলে নিয়ে গেছে। তবে কারা তুলে নিয়ে গেছে তা তারা জানাতে পারেনি। এ বিষয়টি ছিল রহস্যজনক।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, পুলিশি তৎপরতার পর রহমত উল্ল্যাহ ভারত চলে যান। পরে কৌশলে দুই দেশের দালালদের মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করায় গাজীপুর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর বিচারক এখলাস উদ্দিনের আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম/এফএ/জিকেএস