বাগেরহাটে টমেটোর কেজি দুই টাকা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বাগেরহাট
প্রকাশিত: ০৬:৫১ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

অডিও শুনুন

উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে পুষ্টিগুণ সম্পন্ন সবজি টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। এমন ফলনে জেলার টমেটো চাষিদের খুশি হওয়ার কথা থাকলেও এই টমেটোই এখন কৃষদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাইকারি বাজারে টমেটো বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকা কেজি দরে। এমন চিত্র জেলার চিতলমারী, কচুয়া ও মোল্লাহাটসহ সর্বত্র।

এদিকে, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাত্র দুই থেকে তিন টাকা দরে টমেটো বিক্রি হওয়ায় জেলার চাষিদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থায় বাগেরহাট জেলাতে ৫০০ টন টমেটো ক্ষেতেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন বেশি ও বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে।

বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাটে এ বছর ১ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪০ হাজার ৭০০ টন। যেখানে বাগেরহাট জেলায় এ বছর ১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৪২ হাজার ৯০০ টন টমেটো। এর মধ্যে বেশি টমেটো উৎপাদন হয়েছে জেলার চিতলমারী, কচুয়া ও মোল্লাহাট উপজেলায়।

কৃষকদের অভিযোগ, মাসখানের আগেও যে টমেটোর কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা সেই টমেটো পাইকারি বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন টাকা দরে। এমন অবস্থায় চাষিরা ক্ষেত থেকে টমেটো তোলার শ্রমিক খরচই উঠাতে পারছেন না। ফলে ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে মণকে মণ টমেটো। আর ন্যায্য মূল্য না মেলায় রাগ ও ক্ষোভে অনেক কৃষক তাদের টমেটো ফেলে দিচ্ছেন নদী-খালে।

চিতলমারী উপজেলার বাখরগঞ্জ বাজারের টমেটো ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে টমেটো চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবছর আমাদের চিতলমারীতে টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রথমদিকে দামও ভালো পেয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তবে মৌসুমের শেষদিকে টমেটোর দাম একটু কমে যায়। কিন্তু এত কম আমি আমার ব্যবসার জীবনে দেখিনি। মাত্র দুই/তিন টাকা কেজি বিক্রি করে কীভাবে কৃষক ও ব্যবসায়ী বাঁচবে।

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে হলে সরকারিভাবে টমেটো সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

কচুয়া উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের কৃষক আলামিন শেখ বলেন, আমরা মূলত ঘের পাড়ের আইলে টমেটোর চাষ করি। এবছর বিভিন্ন এনজিওসহ লোকজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে প্রায় ৫ লাখ টাকা খাটিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করেছি। এখনো আমার জমিতে প্রচুর টমেটো রয়েছে। প্রায় ২০/২৫ দিন ধরে টমেটোর দাম মাত্র দুই,তিন ও সর্বোচ্চ গেলে চার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমন অবস্থায় ক্ষেত থেকে টমেটো তুলতে পারছি না, কারণ শ্রমিকের মজুরির মূল্যও উঠছে না। বাধ্য হয়ে ক্ষেতেই টমেটো রেখে দিচ্ছি। এখন তা পচে যাচ্ছে।

মোল্লাহাট উপজেলার কৃষক ফয়সাল আহমেদ বলেন, এবছর আগাম জাতের হাইব্রিড টমেটোর চাষ করেছিলাম। বাম্পার ফলনের পাশাপাশি প্রথমদিকে দামও ভালো পেয়েছি। কিন্তু বর্তমানে দাম এতটাই কমে গেছে যে, ক্ষেত থেকে টমেটো তুলে ন্যায্য মূল্য না মেলায় নদী-খালে ফেলে দিচ্ছে বাধ্য হচ্ছি।

তবে কৃষি বিভাগ বলছে, মৌসুমের প্রথমদিকে আগাম জাতের টমেটো চাষ করে ভালো মূল্য পেয়েছেন কৃষকরা।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বাগেরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি টমেটো উৎপাদন হয়, চিতলমারী, কচুয়া ও মোল্লাহাট উপজেলায়। অন্য উপজেলায় সীমিত পরিসরে টমেটোর চাষ হয়। এবছর জেলায় টমেটোর বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কয়েক হাজার টন বেশি উৎপাদন হয়েছে।

তিনি বলেন, জেলায় টমেটো চাষের জমি ও চাষি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া মৌসুমের শেষদিকে টমেটো গাছ প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় টমেটো পেকে যায়। যার ফলে চাহিদার চেয়ে বাজারে সরবরাহ বেশি হচ্ছে। এ কারণে হঠাৎ করে টমেটোর দাম কমে গেছে। যার ফলে কৃষকও কিছুটা বিপাকে পড়েছেন।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জেলার কৃষকদের কৃষক বিজনেস স্কুলের মাধ্যমে সবজির মার্কেটিংয়ের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমরা হাতে-কলমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে আগামীতে কখন, কীভাবে চাষ করলে টমেটোর ভালো উৎপাদনের পাশাপাশি সঠিক মূল্য পাওয়া যায় সে বিষয়গুলো কৃষকরা ভালোভাবে জানতে পারে। আশা করছি, কৃষক বিজনেস স্কুলের মাধ্যমে আগামীতে জেলার সবজি চাষিরা তাদের উৎপাদিত সবজির ন্যায্য মূল্য পাবেন।

এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।