মহৎ ব্যক্তির শূন্যতা ও প্রবাসীদের সম্ভাবনা

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ এএম, ০৩ মার্চ ২০২৬
কাজী এনায়েত উল্লাহ

কাজী এনায়েত উল্লাহ

মহৎ ব্যক্তি কেবল একজন মানুষ নন; তিনি এক চলমান আদর্শ, এক নৈতিক আলোকবর্তিকা, এক মানবিক চেতনার প্রতীক। ইতিহাসে আমরা দেখেছি মানুষ নিজ ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা দেশের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতিকে আপন করে নিয়েছেন, তারাই প্রকৃত মহৎ। তাদের কাছে মানুষই ছিল মুখ্য, পরিচয় ছিল গৌণ।

তাই একজন সত্যিকারের মহৎ ব্যক্তি মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান বা বৌদ্ধ যে ধর্মেরই হোন না কেন তিনি সব মানুষের জন্য সমানভাবে শ্রদ্ধার, সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে যেমন মহাত্মাগান্ধী ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তেমনি মাদার তেরেসা দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবাকে জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

উপমহাদেশে খান আবদুল গফ্ফার খান অহিংস মানবিক সংগ্রামের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাদের জীবন আমাদের শিখিয়েছে মহত্ব কোনো পদবি নয়, কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান নয়; মহত্ব হলো আত্মত্যাগ, নৈতিক সাহস ও সর্বজনীন ভালোবাসার এক অবিরাম চর্চা।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও আমরা এমন অনেক মহৎ মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন। শিক্ষার আলো, চিকিৎসার সেবা, সামাজিক কল্যাণ সবক্ষেত্রেই তাদের অবদান ছিল মৌলিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্তিনির্ভর মানবিক নেতৃত্বের উপস্থিতি যেন কমে এসেছে। প্রতিষ্ঠান আছে, কাঠামো আছে, নাম আছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই আত্মা নেই, যে আত্মা প্রতিষ্ঠানের মূল প্রেরণা ছিল।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে হয় না; রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি গড়ে ওঠে মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। যখন সমাজে এমন মহৎ মানুষের অভাব দেখা দেয়, তখন একটি নীরব শূন্যতা তৈরি হয় যা কেবল অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না, প্রয়োজন হয় দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ ও ত্যাগের।

এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক বিশাল সম্ভাবনার নাম। তারা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রেরক নন; তারা অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির বাহক। পৃথিবীর নানা দেশে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন উন্নত শিক্ষা-ব্যবস্থা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, সুশাসনের মডেল ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের শক্তি।

এই অভিজ্ঞতা যদি দেশের কল্যাণে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে তা হতে পারে এক নতুন মানবিক আন্দোলনের সূচনা। প্রবাসীরা যদি ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে সমষ্টিগত কল্যাণে মনোনিবেশ করেন, তবে তারা নতুন যুগের মহৎ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

প্রবাসী সমাজের শক্তি কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিকও। বিদেশে বসবাস করেও তারা দেশের সঙ্গে আবেগিকভাবে যুক্ত। দেশের দারিদ্র্য, শিক্ষা-ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এসব তাদের হৃদয় স্পর্শ করে। এই আবেগকে যদি সংগঠিত রূপ দেওয়া যায়, তবে তা হতে পারে স্থায়ী পরিবর্তনের ভিত্তি।

উদাহরণস্বরূপ, প্রবাসীদের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেবে না; এটি হবে মানবিকতার প্রতীক, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ সমানভাবে সেবা পাবে। তেমনি প্রবাসীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল ডিগ্রি প্রদান করবে না; এটি গড়ে তুলবে মুক্তচিন্তা, নৈতিকতা ও মানবিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক।

মহৎ ব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তিনি বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকেন। আজকের বিশ্বে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন ক্রমশ বাড়ছে। এই বিভাজনের সময়ে প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা মানুষকে একত্র করবে। প্রবাসীরা বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে বহুত্ববাদকে কাছ থেকে দেখেছেন। তাই তাদের মধ্যে রয়েছে সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা।

এই অভিজ্ঞতা দেশের সমাজে প্রয়োগ করা গেলে তা সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করতে পারে। তারা হতে পারেন এক সেতুবন্ধন দেশ ও বিশ্বের মধ্যে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে, স্থানীয় চাহিদা ও বৈশ্বিক মানের মধ্যে।

তবে প্রবাসীদের এই ভূমিকা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসবে না; প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ কাঠামো। প্রবাসী সংগঠনগুলো যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে মানবিক ও উন্নয়নমূলক কাজকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তাদের কার্যক্রম হবে অধিক ফলপ্রসূ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে তাদের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও প্রয়োজন সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ, যেন প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও উদ্যোগ নিরাপদ ও কার্যকর হয়।

মহৎ কাজ কখনো একদিনে গড়ে ওঠে না; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। প্রবাসীরা যদি একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন, যা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি দেবে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেবে, কৃষকদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে তবে ধীরে ধীরে একটি মানবিক নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এই নেটওয়ার্কই হবে ভবিষ্যতের মহৎ নেতৃত্বের ভিত্তি। ব্যক্তি নয়, একটি সমষ্টিগত চেতনা যেখানে প্রত্যেকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখবে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব। প্রবাসীরা দেশের এক অমূল্য সম্পদ। তাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়, পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হয়। কিন্তু এর চেয়েও বড় অবদান হতে পারে তাদের মানবিক উদ্যোগ। যদি তারা শিক্ষায়, স্বাস্থ্যসেবায়, গবেষণায় ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন, তবে তারা কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখবেন। তখন প্রবাসী পরিচয় হবে শুধু উপার্জনের প্রতীক নয়, মানবিকতার প্রতীক।

শেষ পর্যন্ত, মহৎ ব্যক্তির শূন্যতা কোনো অলৌকিক আবির্ভাবে পূরণ হবে না; এটি পূরণ হবে সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্ববোধে। প্রত্যেক প্রবাসী যদি নিজেকে একজন সম্ভাব্য মানবিক নেতা হিসেবে ভাবেন, তবে সমাজে এক নতুন চেতনার জন্ম হবে। সেই চেতনা হবে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। তখন বাংলাদেশের মাটিতে আবারও গড়ে উঠবে এমন প্রতিষ্ঠান, যা কেবল স্থাপনা নয়, এক জীবন্ত আদর্শের প্রতীক হবে। প্রবাসীদের হাত ধরে যদি এই মানবিক পুনর্জাগরণ শুরু হয়, তবে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠবে যেখানে এক জাতির সন্তানেরা বিশ্বমানবতার সেবায় নিজেদের নিবেদিত করেছে।

মহাসচিব
অল ইউরোপীয়ান বাংলাদেশ আসোসিয়েশন (আয়েবা)
ফ্রান্স
[email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]