প্রতারণায় কোটিপতি, অবশেষে গ্রেফতার
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় অভিনব পদ্ধতিতে এক জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে ঠকিয়ে স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার (১ এপ্রিল) গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
রোববার (২ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফরিদপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মাদ ইমদাদ হুসাইন।

তিনি বলেন, এ চক্রের মূলহোতা সৈয়ব আলী। তিনি একসময় সিনেমা হলের মাইকিং করতেন। পরে খাবার হোটেলে ম্যানেজারির কাজ শুরু করেন। তখন ইমরান, কালাম, মধু খাঁ, মাজেদুল খাঁ নামে কয়েকজনের মাধ্যমে জানতে পারেন কীভাবে প্রতারণা করে সোনা হাতিয়ে নিতে হয়। এরপর স্ত্রী, ভাই ও তার ছেলেকে প্রশিক্ষিত করে তাদের নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তুলে নামেন এ প্রতারণার ধান্দায়। মাত্র একবছরের মধ্যে চক্রটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, নরসিংদী, ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, যশোর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় জুয়েলারি দোকানে প্রতারণা করেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, মাত্র এক বছরের মধ্যেই সৈয়ব আলীর গ্যাং হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকার সোনা। তবে সম্প্রতি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় এমন একটি প্রতারণার ঘটনায় ওই সোনার দোকানির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে বেরিয়ে এসেছে তাদের এসব অজানা তথ্য।
এ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বড় দাউদপুরের সৈয়ব আলী (৪৭), তার স্ত্রী নাজমিন বেগম (৪২), সৈয়দ আলীর ভাই তৈয়ব আলী (৪১) ও তার ছেলে তামিম রহমান সজিব (২১)। তাদের কাছ থেকে ২২ ক্যারেটের চারটি সোনার চেন, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইলফোন জব্দ করা হয়েছে। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল বলে জানিয়েছে।
ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, গত ১৬ মার্চ ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা বাজারে ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ কর্মকারের দোকানে দুই নারী কিছু স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করতে যান। এসময় তাদের কাছে থাকা ২ ভরি ১৫ আনা ওজনের দুইটি সোনার চেন, এক জোড়া কানের দুল, এক জোড়া কানের রিং দেখান। দোকানি স্বর্ণ যাচাই-বাছাই করে দেখেন সেগুলো আসল সোনা। তখন ওই দুই নারী জানান, তারা এর পরিবর্তে টাকা নেবেন না, নতুন অলঙ্কার নেবেন। ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ কর্মকার তাতে রাজি হলে ওই দুই নারী পাশের দোকান থেকে পুরাতন সোনার বাজার মূল্য যাচাই করে আসছেন বলে জানান। কিছুক্ষণ পর তারা দোকানে এসে পুরাতন অলঙ্কার দিয়ে দোকান থেকে নতুন অলঙ্কার নেন এবং যাওয়ার সময় বলেন, পছন্দ না হলে পরবর্তীকালে মডেল পরিবর্তন করতে আসবেন।
এদিকে, কিছুক্ষণ পরে ব্যবসায়ী রবীন্দ্রনাথ কর্মকারের মনে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে তিনি পুরাতন অলঙ্কারগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পান, আগের দেখানো অলঙ্কার আর এগুলো এক নয়। পরেরবার তাকে ইমিটেশন (নকল সোনা) ধরিয়ে ওই দুই নারী তার কাছ থেকে আসল সোনার অলঙ্কার নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। পরে তিনি এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় মামলা করেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমদাদ বলেন, এ ঘটনায় মামলার পর পুলিশ তদন্তকালে বিভিন্নভাবে খোঁজখবর নিয়ে তাদের পরিচয় শনাক্ত করে। এরপর গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে অভিযান চালিয়ে চক্রের চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা একই পরিবারের সদস্য। চক্রের মূলহোতা সৈয়ব আলী ও তার স্ত্রী নাজমিন বেগম। আর সৈয়ব আলীর ভাই তৈয়ব আলী ও তার ছেলে তামিম রহমান সজিব চক্রে জড়িত।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারকরা জানিয়েছেন, এক বছর আগে সৈয়ব আলী এ প্রতারণা সম্পর্কে হাতে-কলমে কৌশল রপ্ত করেন। আর তার স্ত্রী নাজমিন বেগম স্থানীয় পীরগঞ্জের লাকমিঠাপুরের বৃদ্ধা হাসনা বেগমের কাছ থেকে প্রতারণার কৌশল শিখেছেন। তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে ভাই তৈয়ব আলী ও ছেলে তামিম রহমান সজিবকে প্রশিক্ষণ দেন। প্রতারণার মাধ্যমে কোটিপতি সৈয়ব আলী এলাকায় স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি পদ পান। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এই সৈয়ব আলী একটি হত্যা মামলায় এর মাঝে গ্রেফতারও হন।
এন কে বি নয়ন/এমআরআর/জিকেএস