ঈদ কেনাকাটা
কুমিল্লায় পছন্দের শীর্ষে খাদি পাঞ্জাবি
কুমিল্লার তরুণদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী খাদি পাঞ্জাবি। মিহি সুতায় দৃষ্টিনন্দন, আরামদায়ক ও দাম কিছুটা কম হওয়ায় পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে খাদির কাপড়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহারি ডিজাইনের কারণে কুমিল্লার খাদির কদর রয়েছে বিশ্বব্যাপী।
সরেজমিন কুমিল্লা মহানগরীর কান্দিরপাড়, লাকসাম রোড, মনোহরপুর ও রাজগঞ্জ এলাকার খাদি দোকানগুলোতে ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে।
কান্দিরপাড়ের জোসনা স্টোর, খাদি নীড়, পূর্বাশা গিফট অ্যান্ড খাদি, কুমিল্লা খদ্দর, মনোহরপুরে প্রসিদ্ধ খাদি ভাণ্ডার, খাদি ভবন, সৌরভ খাদি ও খাদি বিতানসহ অন্তত অর্ধশতাধিক খাদি দোকানে গিয়ে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়।

আরও পড়ুন: ঈদ কেনাকাটা : জমে উঠেছে ফুটপাতের বাজার
এসব দোকানে শৈল্পিক ডিজাইনের রুচিশীল পোশাক চোখে পড়েছে। প্রতিটি পিস রঙিন ও সাদা পাঞ্জাবির দাম সর্বনিম্ন ৪০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত, থ্রি-পিস ৪০০ থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং শর্ট ফতুয়া ৩০০ থেকে থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত, শাড়ি ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। খাদি কাপড়ের মধ্যে হাতে নকশা করা পাঞ্জাবির দাম একটু বেশি। এছাড়া রয়েছে বিছানা চাদর, গায়ের চাদরসহ বিভিন্ন পোশাকের চাহিদাও রয়েছে। প্রতি পিস বিছানার চাদর বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং নকশি কাঁথা ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।
খাদি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতবর্ষের স্বাধিকার আন্দোলন ও বাঙালি ঐতিহ্য। এ কাপড় মাটির খাদে (গর্তে) বসে তৈরি করা হতো। সে হিসেবে এর নাম দেওয়া হয় ‘খাদি’। শতবর্ষের ঐতিহ্যের খাদি আলোচনায় আসে ১৯২১ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়। তখন মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ভারতবর্ষে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কুমিল্লায় খাদি শিল্প প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেই সময় বিদেশি পণ্য বর্জন করার ডাক আসে। সর্বত্র এক আওয়াজ ‘মোটা কাপড়-মোটা ভাত’। সেই মোটা কাপড় এখন মিহি হয়েছে। কাপড়ে লেগেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। কুমিল্লার খাদি এখন শৈল্পিকতার ছোঁয়ায় দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়ে আসছে। এ কাপড় যাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।
খাদি পাঞ্জাবি কিনতে আসা দিলদার হোসেন পাভেল নামে এক যুবক জাগো নিউজকে জানান, কুমিল্লার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক খাদি কাপড়। ছোট থেকে দেখে আসছি বাপ-দাদাদের পছন্দের তালিকায় খাদি পাঞ্জাবি থাকতো। সে হিসেবে আমরাও খাদিকে না করতে পারিনি। তাই নিজে ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আভিজাত্যের পোশাক খাদি পাঞ্জাবি কিনতে চলে এলাম।
আরও পড়ুন: অনলাইনেও জমেছে ঈদ কেনাকাটা
কুমিল্লার তরুণ উদ্যোক্তা আবু মুছা জাগো নিউজকে জানান, খাদি পাঞ্জাবির চাহিদা সারাদেশে তরুণদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজারের অধিক পাঞ্জাবি বিক্রি করেছি। তার মতো কুমিল্লায় প্রায় অর্ধশতাধিক উদ্যোক্তা রয়েছেন যারা শুধুমাত্র অনলাইনে খাদি পোশাক বিক্রি করে থাকেন।
মনোহরপুর প্রসিদ্ধ খাদি ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী সাইফুদ্দিন আহমেদ লিমন জাগো নিউজকে বলেন, কুমিল্লা খাদি শিল্পের একটা শক্ত ভিত্তি আছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদি শিল্পে লেগেছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। ডিজাইনে এসেছে নতুনত্ব। শতবর্ষের খাদিপণ্য তার গুণগত মান বজায় রেখে আধুনিকতার সংমিশ্রণে প্রতিযোগিতার বাজারে মান ধরে রেখেছে।

কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর জাগো নিউজকে বলেন, খাদির গোড়াপত্তন হয়েছে ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে। ওই সময় শুধু খাদি কাপড় নয়, কুমিল্লার বেনারসি শাড়িরও তুমুল চাহিদা ছিল। সারাবিশ্বেই কুমিল্লার শাড়ি ও খাদি কাপড়ের নামডাক ছিল। স্বদেশী আন্দোলনের পর খাদি কাপড়ের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। মহাত্মা গান্ধী নিজেও খাদির চাদর পরিধান করতেন। কুমিল্লার মানুষও খাদি কাপড় পছন্দ করতেন। বড় বড় নেতারা খাদির পায়জামা, চাদর, পাঞ্জাবি পরে গৌরববোধ করতেন। এটার প্রচলন গত ৩০ বছর আগেও ব্যাপকহারে ছিল। খাদি কুমিল্লাকে ব্র্যান্ডিং করে। ঈদ-পূজায় মানুষ খাদি পোশাক পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
কুমিল্লা জেলা দোকান মালিক সমিতির সভাপতি সাধারণ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খোকন জাগো নিউজকে বলেন, কুমিল্লার খাদি পোশাকের চাহিদা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। বছর জুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর ক্রেতা আসেন কুমিল্লার খাদির খোঁজে। যুগ যুগ ধরে এ শিল্প ধরে রাখবে ঐতিহ্য। খাদি ব্যবসায়ীদের কাছে এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।
জাহিদ পাটোয়ারী/আরএইচ/জিকেএস