অচল ক্রেন-ফর্কলিফটে পণ্যজটের কবলে বেনাপোল স্থলবন্দর

জামাল হোসেন
জামাল হোসেন জামাল হোসেন , উপজেলা প্রতিনিধি, বেনাপোল (যশোর) বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশিত: ০৫:১৩ পিএম, ২১ জুন ২০২৩

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে আমদানি করা পণ্য লোড-আনলোডের কাজে ব্যবহৃত বেশিরভাগ ক্রেন ও ফর্কলিফট দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকলেও মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গ্রেড বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজ। এতে পণ্য খালাস বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্দরে পণ্যজটের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম। ভারী পণ্য ওঠা-নামায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ব্যাহত হচ্ছে রাজস্ব আদায়।

জানা গেছে, স্থলপথে ভারতের সঙ্গে যে আমদানি বাণিজ্য হয় তার বড় অংশ দেশের শিল্পকারখানা স্থাপনের যন্ত্রাংশ, রেল-বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সেতু, কালভার্ট নির্মাণের মালামাল। বেনাপোল স্থলবন্দরে ভারী পণ্য লোড-আনলোডের কাজে পাঁচ বছরের চুক্তিতে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রেড বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজ। ভারী মালামাল লোড-আনলোডের জন্য বন্দরে কমপক্ষে ১৫টি ক্রেন ও ১০টি ফর্ক ক্লিপ প্রয়োজন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে মাত্র সাতটি ক্রেন ও আটটি ফর্কলিফট। এর মধ্যে সচল আছে মাত্র একটি ক্রেন ও একটি ফর্ক ক্লিপ। স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৭০০ ট্রাক পণ্য লোড-আনলোড হলেও এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকের নিচে। এতে পণ্য খালাস কমে বন্দরে পণ্যজটের পাশাপাশি দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

jagonews24

ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্রেন ও ফর্কলিফট পুরোনো হওয়ায় বেশিরভাগ সময় নষ্ট হয়ে পড়ে থাকছে। বন্দর ও ঠিকাদার কর্তৃপক্ষকে বারবার অভিযোগ দিলেও সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে পণ্য পরিবহনকারী ট্রাকচালক মিন্টু রহমান বলেন, বন্দরে ক্রেন, ফর্কলিফট নষ্ট থাকায় পণ্য সময়মতো গন্তব্যে নিতে পারি না। এতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দীন গাজী বলেন, ক্রেন, ফর্কলিফট অচল থাকায় পণ্য খালাস করতে না পারায় বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। সবচেয়ে বেশি রাজস্ব এ বেনাপোল বন্দর থেকে দেওয়া হলেও, বন্দরের সেবার মানের বেহাল দশা।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, প্রতিদিন বেনাপোল বন্দরে প্রায় ভারত-বাংলাদেশ মিলে ৭০০ ট্রাক পণ্য লোড-আনলোডের কাজ হয়। এসব পণ্যের মধ্যে প্রায় ৩০০ ট্রাক ভারী পণ্য রয়েছে। যা খালাস করতে ক্রেন ও ফর্কলিফট প্রয়োজন হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলার পরও তারা বিষয়টি ঠিকাদারের উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। অথচ বন্দরের ভাড়া তারাই নিচ্ছেন।

jagonews24

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্দর বিষয়ক সম্পাদক মো. মেহেরুল্লাহ বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বর্তমানে বিদ্যুৎ, রেল প্রকল্পের মালামাল বেশি আসছে। কিন্তু বন্দরে চাহিদার তুলনায় এসব ভারী মালামাল ওঠানোর ক্রেন ও ফর্কলিফট কম। তাছাড়া বেশিরভাগ সময় এসব নষ্ট থাকায় বন্দরে পণ্যজট বেড়েছে। অচল হয়ে পড়া ক্রেন-ফর্কলিফট সারানোর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে গত ৭ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষকে লিখিত পত্র দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গ্রেড বেঙ্গল এন্টারপ্রাইজের মেকানিক বাদশা মিয়া বলেন, নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা ক্রেন, ফর্কলিফটের যন্ত্রাংশ জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহ করতে না পারায় মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে পণ্য খালাসে বিঘ্ন ঘটছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। ক্রেন, ফর্কলিফটের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে অনেকটা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান বলেন, এক বছর ধরে বন্দরে ক্রেন, ফর্ক ক্লিপের সমস্যা চলছে। এখন তা আরও বাজে অবস্থায় নেমেছে। গত সপ্তাহ থেকে চাহিদার বিপরীতে ২০ শতাংশ ভারী পণ্য বন্দর থেকে খালাস হচ্ছে। এতে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকা ৩০০ ভারতীয় ট্রাক প্রতি দিনে ৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে। এছাড়া বন্দর ইয়ার্ডে পড়ে থাকা প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন পণ্যের বন্দর ভাড়া বাবদ প্রতিদিন মাশুল গুনতে হচ্ছে।

jagonews24

ভারী পণ্য লোড-আনলোডে বন্দরের নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আড়াই বছর আগে যখন বন্দরের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়, তখন মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পণ্য খালাসের কথা ছিল। তবে গত মাসে তাদের খালাস করতে হয়েছে ৯২ হাজার মেট্রিক টন পণ্য। অতিরিক্ত চাপ নেওয়ায় ক্রেন, ফর্কলিফটের যন্ত্রাংশ বারবার অচল হচ্ছে। টেন্ডারের শর্ত সংশোধন না করলে অতিরিক্ত ক্রেন, ফর্কলিফট সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দরে নতুন অধিগ্রহণকৃত ২৪ দশমিক ৯৮ ও ১৬ একর জমির উপর প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হলে এ বন্দর দিয়ে পণ্যহ্যান্ডলিং কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে প্রেক্ষিতে বন্দরের ইক্যুইপমেন্ট সচল রাখা প্রয়োজন। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুন বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে সমগ্র বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে চলমান সংকটের সমাধান হবে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।