সড়ক দুর্ঘটনায় পা বিচ্ছিন্ন

সন্তানরা কোলে নিয়ে হাঁটার বায়না ধরলে শুধুই কাঁদেন বাবা

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৫:১০ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২৩

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার নুরুল আলাল (৩৫) ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল যুবক। উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের মিয়াজির পাড়ার মোহাম্মদ শফি ও বেগম শফি দম্পতির ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের মধ্যে সবার বড় আলাল আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করা। বোনদের বিয়ে দিয়ে বাবা-মা, চার ভাই, স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। পরিবারের ১০ সদস্যের ভরণ-পোষণে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় উঁচু বেতনে চাকরি করতেন। সুখী পরিবার হিসেবে এলাকায় ভালোই নাম ছিল তাদের। কিন্তু ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় আলাল প্রাণে বাঁচলেও পা হারিয়ে আজ নিঃস্ব। দুই বছরের মেয়ে তাসনিয়া আলাল ও দশ মাসের ছেলে তাসনিম আলালসহ স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালেই দিন কাটছে আলালের স্ত্রী হীনু আরার।

সেদিন কী ঘটেছিল জানতে চাইলে আলাল বলেন, গত ২ জুন রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা। অধিকাংশ যাত্রী ঘুমাচ্ছিলেন। তিনিও (নুরুল আলাল) কিছুটা ঘুমের মধ্যেই ছিলেন। হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখেন বেপরোয়া গতিতে ছুটছে তাদের বাস। আরও কয়েক যাত্রী জেগে সামলে গাড়ি চালাতে চালককে অনুরোধ করছিলেন বার বার। কিন্তু তিনি (চালক) কারো কথায় কর্ণপাত না করে গতি বাড়িয়ে চালান। অকস্মাৎ চট্টগ্রামগামী এক ট্রাকের পেছনে ধাক্কা লেগে তাদের বহনকারী সৌদিয়া পরিবহনের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলে মারা যান গাড়ির হেলপার। এক সিট পেছনে বি-সিরিয়ালে বসা আলালের ডান পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে হাঁটুর নিচ থেকে কাটা পড়লে অজ্ঞান হয়ে যান।

হাসপাতালে থাকা আলাল আরও বলেন, ঢাকায় বদলি হওয়ায় বউ-বাচ্চা নিয়ে আসতে বাসা নিয়েছিলাম। পহেলা জুন (বৃহস্পতিবার) অফিস শেষে রাত সোয়া ১১টার সৌদিয়া পরিবহনের বাসে (চট্টমেট্রো-ব-১১-০৬৯৮) বি-৪ সিট নিয়ে ঢাকা থেকে মহেশখালীর উদ্দেশে রওনা হই। পথিমধ্যে শেষ রাতে বাস চালকের অপেশাদারি আচরণে মাত্র কয়েক মিনিটের এক দুর্ঘটনায় আমি ও আমার পরিবারের স্বপ্নও চুরমার হয়ে যায়। এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে আমার ও ছোট্ট বাচ্চা দুটোর ভবিষ্যত।

আলালের বাবা মোহাম্মদ শফি বলেন, চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক এবং সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে আলাল। আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠার আগেই পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় যোগ দিয়েছিল। ছোট ভাই-বোন সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত করিয়েছে। পারিবারিক স্বচ্ছলতার পর দুই অবুঝ শিশুর ভবিষ্যত গড়তে বদলি পেয়ে ঢাকায় গিয়েছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেলো।

আলালের স্ত্রী হীনু আরা বলেন, আমরা প্রতিবেশী ইউনিয়নের বাসিন্দা। একসঙ্গে চট্টগ্রাম অবস্থানকালীন সহযোগিতা দিয়ে আমাকেও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করিয়েছে আলাল। সবাইকে সহযোগিতা করে পরিচ্ছন্নভাবে চলার স্বপ্ন দেখা আলাল এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁদছে। নিজের অজান্তেই পা হারানোর কথা ভুলে বিছানা থেকে উঠে পা-বাড়াতে গিয়ে ফ্লোরে পড়ে কাতরান। এটা অসহ্য লাগে। বাচ্চারা কোলে নিয়ে হাঁটার বায়না ধরলে তাদের নিতে না পেরে চোখের পানি ছেড়ে দেন আলাল। এসব দেখে কলিজা মোচড় দিয়ে ওঠে।

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করে রাত বিরাতে কাঁদেন আলাল। দুই দফা অস্ত্রোপচারে ডান পা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত কেটে ফেলেছেন চিকিৎসকরা। এরপরও পরিপূর্ণ সেরে ওঠেনি। এখনো ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আবারও অস্ত্রোপচারের কথা বলা হচ্ছে। বাম পায়ের আঘাত এখনো ভালো হয়নি। গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে গেলেও এখন পুরোপুরি পরনির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে হচ্ছে একসময়ের স্বনির্ভর আলালকে।

আক্ষেপের সুরে আলাল বলেন, এতবড় একটি দুর্ঘটনার পর যানবাহন মালিক, তাদের সমিতি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর কেউই আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। এ পর্যন্ত চার লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। সামনের দিনে আরও কত টাকা খরচ হবে জানা নেই। চাকরিস্থল থেকে সহমর্মিতা না পেলে চিকিৎসায় এতদূর আসা অসম্ভব ছিল। সৌদিয়া পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

আলাল বাচ্চা দু’টির জন্য কৃত্রিম পা লাগিয়ে হলেও আবার হাঁটতে চান। ক্ষতিপূরণ পেতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আইনজীবীদের সহযোগিতা চেয়েছেন আলাল ও তার পরিবারের সদস্যরা। রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ জীবন ও মৃত্যুর নিশ্চয়তা আশা করেন তারা।

জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার এসআই মাহফুজুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার বিষয়ে সৌদিয়া পরিবহনকে অভিযুক্ত করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৯৮/১০৫ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে (মামলা নং- ৩(০৬)২৩)। উক্ত মামলা মূলে সৌদিয়া পরিবহনের বাস এবং ট্রাক জব্দ করলেও সেই এখনো গ্রেফতার করা যায়নি।

সৌদিয়া পরিবহনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) কফিল উদ্দিন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ এখন সরকারের হাতে। ওইদিনের দুর্ঘটনায় আমাদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরপরও আলালের পরিবার যোগাযোগ করলে আমার ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে সহযোগিতার চেষ্টা করবো। এজন্য তিনি সৌদিয়া পরিবহনের কক্সবাজার অঞ্চলের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।