ভুরুঙ্গামারীতে আ.লীগের ভরাডুবি : কুড়িগ্রামজুড়ে তোলপাড়


প্রকাশিত: ০২:২১ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০১৬

কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ ও সাধারণ সম্পাদক নুরন্নবী চৌধুরী খোকনের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দ্বিতীয় দফার ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটেছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর মতামতকে উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। শুধু তাই নয়, রাজাকারের সন্তানকে মনোনয়ন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর সহোদর ভাইকে করা হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

এসব স্পর্শকাতর অভিযোগ উল্লেখ করে পদত্যাগ করেছেন ভুরুঙ্গামারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক মন্টু।

বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফার ইউপি নির্বাচনে ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে ছয় ইউনিয়নে পরাজয় ঘটেছে আওয়ামী লীগের। তিনটিতে বিজয়ী হয়েছে জাতীয় পার্টি, ২টিতে বিএনপি এবং একটিতে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। এ ভরাডুবির ঘটনায় কুড়িগ্রাম আওয়ামী লীগে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
 
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরন্নবী চৌধুরী খোকন তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তৃণমূলের দেয়া মতামতের ভিত্তিতে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়। পরে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাজ না করায় পরাজয় বরণ করতে হয়। আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়নে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার মূল কারণ দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী ছিল তারপক্ষে। তাদের চিহিৃত করে শিগগিরই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাংগঠনিক সম্পাদক মন্টুর পদত্যাগের বিষয়টি তার জানা নেই বলে তিনি জানান। আর মন্টু পদত্যাগ পত্রে সেসব অভিযোগ করেছে তা মনগড়া এবং ভিত্তিহীন বলে জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, দুটি ইউনিয়নে রাজাকারের সন্তানকে মনোনয়ন দেয়ার যে অভিযোগ ওঠে তারা পুরোপুরি সত্য নয়। কারণ তাদের বাবা মুসলিমলীগ করলেও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাও করেনি। আর তাদের সন্তানরা নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ। শুধু তাই নয়, তারা গত ১০ বছর থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।  

পদত্যাগকারী নেতা এমদাদুল হক মন্টু বলেন, ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় নৌকার দূর্গ তারপরও পরাজয় মেনে নেয়া যায় না। মূলত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ ও সাধারণ সম্পাদক নুরন্নবী চৌধুরী খোকনের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং তৃণমূল নেতাকর্মীর মতামত উপেক্ষা করাই ভরাডুবির নেপথ্য কারণ। দুটি ইউনিয়নে রাজাকারের সন্তানকে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী করা হয়েছে। এসব ভোটের বাজারে বিরুপ প্রভাব ফেলে।

তিনি শনিবার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বরাবর এ পদত্যাগপত্র জমা দেন। তিনি দাবি করেন, একই দাবিতে খুব শিগগিরই উপজেলা আওয়ামী লীগের আরো ২০/২৫ জন নেতা গণপদত্যাগ করবে।
 
ভুরুঙ্গামারী সদর ইউপির সদ্যবিদায়ী সভাপতি দুলাল হোসেন বলেন, দলে গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের চাহিদা মতো এক লাখ টাকা না দেয়ায় ৬ মাস পূর্বে আমাকে অব্যাহতি দিয়ে বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেনকে (রিটার্ড আর্মি) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। যা গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। দলীয় কোন্দল, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম এবং মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করায় ভুরুঙ্গামারীতে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদত্যাগ পত্রে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অস্বচ্ছতাসহ গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।
 
আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়নে বিজয়ী হয় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রাজু আহমেদ খোকন। তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ২নং ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি।

তিনি বলেন, ইউনিয়নের বর্ধিত সভার আগে আমাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে তালিকা দেয়া হয় সে মোতাবেক আমি দ্বারে দ্বারে গিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার কথা জানাই। কিন্তু বর্ধিত সভায় দেখা যায় সেই তালিকা বদলে আত্মীয় স্বজনের নাম ঢোকানো হয়। আমি ২৬ ভোট পেয়ে হেরে যাই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের টু-থার্ড নেতাকর্মী আমাকে অভয় দেয় তারা আমার সঙ্গে থাকবে। আর সে কারণে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া মার্কা নিয়ে ৫ হাজার ৩৭৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হই। আর টাকার বিনিময়ে দেয়া দলের প্রার্থী পায় ৫ হাজার ৫২ ভোট।
 
তিলাই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী আবুল হোসেন মন্ডল জানান, দল মনোনয়ন দিলেও দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী মাঠে ছিল না। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এবং ২নং ও ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী ভোটে আমার বিরোধীতা করে। শুধু তাই নয় নৌকার পক্ষের লোকজনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এছাড়া জাতীয় পার্টির লোকজন বিএনপির সঙ্গে আতাত করে ভোট বিনিময় করে। এ সবই ভরাডুবির মূল কারণ।

তিলাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম বলেন, মাঠ পর্যায়ে বর্ধিত সভায় কাউন্সিলররা টাকার বিনিময়ে ভোট দেয়ায় জনপ্রিয় প্রার্থী নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দলের সম্ভাব্য ৪ চেয়ারম্যান প্রার্থী আন্তরিকভাবে কাজ না করায় পরাজয় ঘটে। আমাদের প্রার্থী সব কেন্দ্রে পুলিং এজেন্ট রাখতে পারেনি। ছিল না নির্বাচনী খরচ। ফলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা শেষ পর্যন্ত মাঠ ছেড়ে দেয় ভোটের দু’দিন আগে।
 
ভুরুঙ্গামারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এমএএস/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।