৭ খুনের দুই বছর আজ
আজ ২৭ এপ্রিল (বুধবার)। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের দুই বছর পূর্তি। ইতোমধ্যে ৭ খুনের ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত দুটি মামলায় দুইজন বাদী, দুইজন ম্যাজিস্ট্রেটসহ ৩০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এ মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে হত্যাকেণ্ডের দীর্ঘ ১৭ মাস পর ভারত থেকে নারায়ণগঞ্জে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামি কারাগারে আটক থাকলেও এখনও ধরা পড়েনি চার্জশিটের অভিযুক্ত ১২ আসামি।
এদিকে, ৭ খুনে নিহতদের আত্মীয়-স্বজনদের কান্না গত দু’ বছরেও থামেনি। স্বজনদের একটাই দাবি, এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যেতে চান।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্করোডের ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের সহযোগী ৭ নং ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী মনিরুজ্জামান স্বপন, সহযোগী তাজুল ইসলাম ও স্বপনের প্রাইভেটকার চালক জাহাঙ্গীর, নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও প্রাইভেটকারের চালক ইব্রাহিম অপহৃত হয়। অপহরণের তিনদিন পর ৩০ এপ্রিল বন্দর থানার কলাগাছিয়ার শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে নজরুল ইসলামসহ ৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ১ মে নজরুলের বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ হত্যাকাণ্ডের পর নিহত নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম ওরফে শহিদ চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশেনের তৎকালীন ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেন ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাবকে দিয়ে সাতজনকে হত্যা করিয়েছে। র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এম এম রানাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেয়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অন্যান্য র্যাব সদস্যদ্যের সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসলে তাদেরও পর্যায়ক্রমে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
এ নৃশংস হত্যাকেণ্ডের ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার ৪ সহযোগী হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি এবং সিনিয়র আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ির চালক ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে একটিসহ ফতুল্লা মডেল থানায় দুটি মামলা দায়ের করে। গত বছরের ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মন্ডল নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
আদালতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৭ খুনের দুটি মামলায় নূর হোসেন ও র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) এম এম রানাসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারন করেন। তবে র্যাবের ৮ সদস্যসহ পলাতক ১২ আসামির অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্য শুরু হয়েছে। পলাতক ১২ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের খরচে ৫ আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মামলাটি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চলছে।
এদিকে, আদালতে অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে ১২ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামিরা হলেন-অবসরপ্রাপ্ত র্যাব সদস্য কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আব্দুল আলিম, মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমিন শরিফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবির, এএসআই কামাল হোসেন, কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, নূর হোসেনের সহযোগী সেলিম, সানাউল্লাহ ছানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন।
এদিকে, দুটি মামলার একটির বাদী নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও আরেকটির বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমাল পাল আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়াও এ মামলায় আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণকারী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনসহ ৩০ জন সাক্ষ্য দিয়েছে।
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি জানান, ৭ খুনের বিচারের জন্য সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।৭ খুনের আসামি নূর হোসেনসহ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই। সাক্ষীদের হুমকি দেয়া হচ্ছে, আমাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে, আমার ভাই, দেবর, ননদের ছেলেসহ যারা ৭ খুন মামলার সাক্ষী তাদের নামেও নূর হোসেনের আত্মীয় ৭টি মামলা দিয়েছে।
সাত খুনে নিহত স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের অসহায় স্ত্রী শামছুন নাহার নুপুর জানায়, জাহাঙ্গীর নিহত হওয়ার ২ মাস পর আমার কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। আমি এখন খুবই অসহায় জীবন-যাপন করছি। আমি এখন নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করছি। আমাদের খোঁজ-খবর কেউ নেয়নি। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আইভী আপা আমাকে সিটি কর্পোরেশনে একটি চাকরি দিয়েছে। এ চাকরির আয় দিয়ে কোনো মতো সংসার চালাচ্ছি।
নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের জানান, ছেলে হারানোর দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। শুধু আমার ছেলেকেই হত্যা করেনি। পুরো একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমার ছেলের শোকে আমার বৃদ্ধ বাবা ও বৃদ্ধা মা (তাজুলের দাদা-দাদী) মৃত্যু বরণ করেছে। বর্তমানে সাক্ষ্য চলছে। জানি না শেষ পর্যন্ত কি হয়।
নিহত নজরুলের ভাই আবদুস সালাম জানান, ‘আমরা যখন সাক্ষ্য দেই তখন নূর হোসেন আকার ইঙ্গিতে ও ঠোঁটে বার বার আঙ্গুল রেখে চোখ রাঙিয়ে চুপ করতে বলেন। এ ধরনের আচরণে আমরা কিছুটা আতঙ্কিত।’
এর আগেও নূর হোসেন সাক্ষীদের প্রতি চোখ রাঙানো ছাড়াও ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে চুপ থাকার হুমকি দেন বলে জানান নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ছোট ভাই মিজানুর রহমান রিপন।
তিনি আরও জানান, ৭ খুনের বিচার যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় তাহলে আমরা ন্যায় বিচার পাব বলে আশা রাখি।
আবদুস সালাম ও মিজানুর রহমান রিপন জানান, দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পরিবারের পক্ষ থেকে কাঙালিভোজের আয়োজন করা হবে।
হোসেন চিশতী সিপলু/এসএস/পিআর